সাতকানিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত

বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সঙ্কট প্রকট, প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল সরকারি সহায়তা

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বন্যা পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত অবস্থায় রয়েছে। তবে কিছু কিছু উঁচু এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করলেও অনেক পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে।

মনজুর আলম, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম)

Location :

Satkania
বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সঙ্কট প্রকট, প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল সরকারি সহায়তা
বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সঙ্কট প্রকট, প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল সরকারি সহায়তা |নয়া দিগন্ত

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বন্যা পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত অবস্থায় রয়েছে। তবে কিছু কিছু উঁচু এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করলেও অনেক পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। এদিকে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো তাদের এলাকা থেকে পানি নেমে যাওয়ায় নিজ নিজ ঘরে ফিরে গেছে বলে জানিয়েছেন সাতকানিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো: আলমগীর।

তবে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধসঙ্কট। ক্ষতিগ্রস্তদের তুলনায় সরকারি বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল হওয়ায় চরম কষ্টে রয়েছেন বন্যাকবলিত এলাকার লোকজন। এ ছাড়া গবাদিপশুর খাবারের সঙ্কট দেখা দেয়ায় ভীষণ বিপাকে পড়েছেন খামারিরা।

এদিকে বন্যার এই মারাত্মক পরিস্থিতিতে উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের দাফন করাও দুঃসাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিগত ছয় দিন ধরে সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার সব কটি এলাকার মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগ এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে চার লাখের মতো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। কৃষি ও ফসলি জমি, মৎস্য খামার, বসতঘর ও রাস্তাঘাট বন্যার পানিতে ডুবে যায়।

ফলে ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয় লোকজনকে। রোববার (১২ জুলাই) উপজেলার কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গেলে পানিবন্দি থাকা কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা জানান, শুধু পানিবন্দি নয়, তারা এখনো পর্যন্ত পাননি কোনো ধরনের সরকারি-বেসরকারি সহায়তা।

এদিকে বন্যাকবলিত এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনে ঢেমশা, ছদাহা, কেঁওচিয়া, বাজালিয়া ও পৌর এলাকার অনেক পানিবন্দি পরিবারের সাথে কথা হলে তারা জানান, বিগত ছয় দিন ধরে তারা নিজের ঘরেই পানিবন্দি অবস্থায় আছেন। টিনের চালা বেড়ার ঘরে পানি প্রবেশ করায় পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘরেই কাটিয়েছেন দিন-রাত। ঘর থেকে পানি নেমে গেলেও বাড়ির উঠানে এখনো রয়ে গেছে হাঁটুসমান পানি। ঘরে যে শুকনো খাবার আগে ছিল সেগুলো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।

বাড়ির পার্শ্ববর্তী কিছু ব্যক্তির দেয়া শুকনো খাবার খেয়ে তারা ক্ষুধা নিবারণ করে আছেন। ছয় দিন যাবত এক কাপড়ে কোনো রকম গোসলবিহীন রয়েছেন তারা। প্রকৃতির ডাক সেরেছেন বন্যার পানির মধ্যেই।

তারা আরো জানান, বন্যার আগে বিভিন্ন দিনমজুরের কাজ করে পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ করতাম। এখন বন্যার কারণে ঘরবন্দি, কোনো কাজে যেতে পারছি না, সেহেতু এখন টাকা-পয়সা রোজগার করতে পারছি না। সে কারণে নিদারুণ কষ্টে দিনযাপন করছি আমরা।

ঢেমশা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু তাহের জানান, আমি ব্যক্তিগতভাবে ঢেমশা ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অনেক পরিবারের কাছে শুকনো খাবার বিতরণ করেছি, যা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এ ছাড়া সরকারিভাবে এক টন চাল বরাদ্দ পেলেও সেগুলো এখনো বিতরণ করতে পারিনি।

এদিকে সরকারি-বেসরকারি ও বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষজনের মধ্যে বিতরণ করা ত্রাণগুলো প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। অনেক এলাকার পানিবন্দি লোকজন অভিযোগ করে বলেন, ত্রাণ পাওয়া তো দূরের কথা, এখনো পর্যন্ত তাদের খোঁজখবর পর্যন্ত কেউ নেয়নি।

সাতকানিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো: আলমগীর জানান, এ পর্যন্ত সাতকানিয়ার জন্য ১৭৫ মেট্রিক টন চাল ও ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে ৭৫ টন বিতরণ শেষ হয়েছে। আরো ১০০ টন চাল প্যাকেট করা হচ্ছে। প্রতি প্যাকেটে ১০ কেজি করে চাল থাকবে। এ ছাড়া টাকাগুলো দিয়ে চিঁড়ে, মুড়ি, চিনি, বিস্কুট, ওরস্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ওষুধ ও দুই লিটার করে একটি পানির বোতলসহ শুকনো খাবারের একটি করে প্যাকেট করা হয়েছে। এরকম ২৩৫০ প্যাকেট পানিবন্দি পরিবারে বিতরণ করা হয়েছে। কিছু প্যাকেট উপজেলায় রয়েছে।

তিনি আরো জানান, নতুন করে আবারো ৩০ মেট্রিক টন চাল ও ২০ লাখ টাকার চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য ৫০০০ করে শুকনো খাবারের প্যাকেট পাওয়ার জন্য আরেকটা চাহিদাপত্র তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।

এদিকে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা: অমিত দে জানান, প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে ১৭টি মেডিকেল টিম গঠন করেছি। প্রতিটি টিমে সদস্যসংখ্যা চারজন। সেই টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন একজন মেডিকেল অফিসার। অন্য সদস্যরা হলেন—স্বাস্থ্য সহকারী, ফার্মাসিস্ট ও কমিউনিটি হেলথ প্রোভাইডার। এ ছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও প্রস্তুত রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় মেডিকেল টিম। যে টিমের সদস্যরা পৌরসভা এলাকার সব ওয়ার্ডেই চিকিৎসা সেবা দিতে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত। কাল (সোমবার) থেকে ১০টি ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদ চত্বরে মেডিক্যাল টিম বসানো হবে।

তিনি আরো জানান, সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসার জন্য ১০০টি অ্যান্টি-স্নেক ভেনম বা সাপের বিষের প্রতিষেধক হাসপাতালে রয়েছে। আরো ১০০টি প্রতিষেধকের জন্য চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া আপাতত প্রয়োজন মেটানোর চিকিৎসা দিতে হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও ওষুধ মজুদ রয়েছে। শুধু তাই নয়, বন্যা-পরবর্তী ডায়রিয়া, আমাশয়, জ্বর, হেপাটাইটিস, চর্মরোগ ইত্যাদি মোকাবিলার জন্যও আমাদের হাসপাতালে আগাম প্রস্তুতি রয়েছে।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, উপজেলার প্রায় অধিকাংশ প্রধান প্রধান সড়ক থেকে পানি নেমে গেছে। এ ছাড়া নিচু জায়গায় এখনো পানি রয়ে গেছে। জনগণকে দুর্ভোগ থেকে বাঁচাতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই দুঃসময়ে সমাজের বিত্তবান মানুষদের বন্যার্তদের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান ইউএনও।