সিলেট বিভাগের সীমান্ত এলাকায় ২০২৫ সালের ১১ মাসে ১৩ জন নিহত হয়েছেন। একের পর এক হত্যার ঘটনায় রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে সীমান্ত। ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) ও ভারতের সশস্ত্র খাসিয়াদের বেপরোয়া আক্রমণের মুখে বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছেন বাংলাদেশের বাসিন্দারা।
শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের দমদমা সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সশস্ত্র খাসিয়াদের গুলিতে বাংলাদেশী দুই তরুণ নিহত হয়েছেন।
নিহতরা হলেন উপজেলার দমদমা সীমান্তের পূর্ব তুরুং গ্রামের মো: বুরান উদ্দীনের ছেলে আশিকুর (১৯) ও ওই গ্রামের মরহুম রব মিয়ার ছেলে মোশাঈদ।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দমদমা সীমান্তের পরিহাট নামক স্থানে সুপারি আনতে গেলে ভারতীয় খাসিয়ারা গুলি ছোঁড়ে। এতে আশিকুর ও মোশাহিদ নিহত হন।
প্রতি বছরই বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয় বিএসএফ। তবে সেটি শুধু কাগজে কলমে থেকে যায়। সর্বশেষ গত ২৫ থেকে ২৮ আগস্ট রাজধানী ঢাকায় বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৬ তম সম্মেলনে সীমান্তে হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ভারত। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতির একদিন পরই ২৯ আগস্ট সিলেটের কানাইঘাট সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন এক বাংলাদেশী। ফলে প্রতিবারই বিএসএফের প্রতিশ্রুতি কেবল আশ্বাসেই থেকে যায়।
এর আগে, ২০১৪ সালে সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার বন্ধে দু‘দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়। কিন্তু তা নিয়মিত উপেক্ষা করছে ভারত।
বিজিবি জানিয়েছে, চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি থেকে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সিলেট জেলার কানাইঘাট সীমান্তে চারজন, কোম্পানিগঞ্জে দু’জন, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া সীমান্তে তিনজন, হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট সীমান্তে একজন ও সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার ও বিশ্বম্ভরপুর সীমান্তে তিন বাংলাদেশী বিএসএফের হাতে নিহত হয়েছেন।
তথ্য মতে, চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের দশটেকি (নতুন বস্তি) এওলাছড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় আহাদ আলী নামে এক বাংলাদেশী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। আন্তর্জাতিক সীমানা রেখার পাঁচ গজ ভেতরে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ভারতীয় নাগরিক হায়দার আলী ও তার সহযোগীরা মিলে পিটিয়ে আহাদ আলীকে হত্যা করেন। পরে তার লাশ সীমান্তের ভেতরে ফেলে পালিয়ে যায় ভারতীয় নাগরিকরা।
গত ৩১ মে একই উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের দত্তগ্রাম সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে প্রদীপ বৈদ্য (২২) নামে এক বাংলাদেশী তরুণ নিহত হন। নিহত প্রদীপ দত্তগ্রামের শৈলেন্দ্র বৈদ্যের ছেলে। পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে নিহতের লাশ বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে বিএসএফ।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত আরো তথ্য থেকে জানা গেছে, গত ২৯ আগস্ট সিলেটের কানাইঘাটের ডোনা সীমান্তে ভারতীয় অংশে বাংলাদেশী যুবক আব্দুর রহমানকে (৪০) গুলি করে হত্যা করে বিএসএফ। নিহত আব্দুর রহমান কানাইঘাট উপজেলার আটগ্রাম বড়চাতল (বাকুরি) গ্রামের মো: খলিলুর রহমানের ছেলে। হত্যার পর তার লাশ নিয়ে যায় ভারত এবং চারদিন পর পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে লাশ বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে বিএসএফ।
অপরদিকে চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মাছিমপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে সাইদুল ইসলাম (২৩) নামে এক বাংলাদেশী নিহত হন। নিহত সাইদুল ইসলাম উপজেলার গামাইতলা গ্রামের মো: জয়নাল আবেদীনের ছেলে। সাইদুল ইসলাম সীমান্ত এলাকায় নিজের গরু আনতে গেলে নো ম্যানস ল্যান্ডের কাছাকাছি পৌঁছান। তখন বিএসএফ গুলি চালায়। গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে সাইদুলকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে তাকে উদ্ধার করে বিশ্বম্ভরপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখান থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
গত ১১ জুলাই একই জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার বাগানবাড়ি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে শফিকুল ইসলাম (৪৫) নামে এক বাংলাদেশী নিহত হন। তিনি উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনিও সীমান্তে গরু আনতে গিয়ে নিহত হন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে।
এদিকে, গত ৬ জানুয়ারি সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বড় কেয়ারা সীমান্ত এলাকায় জহুর আলী (৫৫) নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে বিএসএফ। তিনি ওই উপজেলার পশ্চিম ডুলনা গ্রামের বাসিন্দা। জহুর আলীকে হত্যা করে লাশ বিএসএফ ত্রিপুরা রাজ্যের খোয়াই মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যায়। দু’দিন পর পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তার লাশ হস্তান্তর করে।
গত ৪ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার মুরইছড়া সীমান্তে সুকিরাম (২৫) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে বিএসএফ। পরে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে লাশ ফেরত দেয়া হয়।
শুধুমাত্র কানাইঘাট উপজেলায়ই চারজনকে গুলি করে হত্যা করেছে ভারত।
নিহতরা হলেন দনা পাত্তিছড়া গ্রামের আব্দুর রহিম ওরফে সোনাচানের ছেলে শাকিল আহমদ, বড়চাতল পূর্ব গ্রামের মরহুম খলিলুর রহমানের ছেলে আব্দুর রহমান, লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের মঙ্গলপুর আলুবাড়ি এলাকার শাহেদ আহমদ (২৫) এবং মুলাগুল বাংলাটিলা গ্রামের মরহুম মখরম আলীর ছেলে জামাল উদ্দিন (৪৫)।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, সবমিলিয়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ১১ মাসে বিএসএফের গুলিতে ৩২ বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন।
এদিকে, সীমান্তে গুলির জন্য অবৈধ অনুপ্রবেশকে যুক্তি দেখাচ্ছে ভারত। তবে বাংলাদেশ বলছে, এ অজুহাতে নিরস্ত্র নাগরিক হত্যা করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে ভারত। সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিশ্রুতিও ভঙ্গ করেছে ভারত।
বিজিবি বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ক্ষমতার পট-পরিবর্তনের পর তারা সীমান্তে তৎপরতা বাড়িয়েছে। তবুও সীমান্তে চোরাকারবারি ও মাদক পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য থামছে না। বাংলাদেশী নাগরিকদের সীমান্তের আন্তর্জাতিক শূন্য রেখা মেনে চলার অনুরোধ জানিয়েছে বিজিবি।
বিজিবির কর্মকর্তারা জানান, সীমান্তে কোনো হত্যাই কাম্য নয়। এ ব্যাপারে বিএসএফকে সবসময় কড়া প্রতিবাদ জানায় বিজিবি।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত পৃথিবীর একমাত্র সীমান্ত, যেখানে মানুষকে গুলি করে মারা হয়। এটাকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছে দিল্লি। অপরাধ হলে কোর্টে সোপর্দ হবে। কোর্ট তাকে শাস্তি দেবে। আমি স্পষ্টভাবেই বলেছি, এটার কোনো সমাধান আমি আপাতত দেখছি না।’
অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেন, ‘সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের মতো ভারতও উদ্বিগ্ন। তবে ভারতীয় সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মানবপাচার, চোরাকারবার ও অস্ত্র পাচার বন্ধ হলে সীমান্তে হত্যাও বন্ধ হয়ে যাবে। নিজের ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকে বিএসএফ। চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্তের অধিকাংশ ভারতীয় অংশে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া হয়েছে। বাকি অংশে বেড়া দেয়া শেষ হলে সীমান্তে অপরাধ কমবে।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, ‘যদি কোনো চোরাকারবারি বা অন্য কোনো তৎপরতা সেখানে থেকে থাকে, যেকোনো কারণেই মানুষকে হত্যা করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের যে একটা বিরূপ ধারণা জন্মায়, তার একটা প্রধান কারণ হচ্ছে সীমান্ত হত্যা। আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের একটা প্রধান অন্তরায় এটা।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকারে যারা আছেন, তাদের কাছে আমরা বিভিন্ন সময় চিঠি দিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে ভারতের ওপর এক ধরনের চাপ আনতে পারি।’
বিজিবির সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হক জানান, সীমান্ত হত্যা অত্যন্ত অমানবিক, আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং অগ্রহণযোগ্য। সীমান্তে কোনো বাংলাদেশী অপরাধ করলে তার ব্যাপারে দু’দেশের সীমান্ত আইন অনুযায়ী বিচার হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা ভারতীয় কাউকে পেলে তাদের কাছে হস্তান্তর করবো। তারা বাংলাদেশী কাউকে পেলে আমাদের কাছে হস্তান্তর করবে। কিন্তু গুলি করে হত্যার মতো অমানবিক ও লোমহর্ষক কাজ উভয় দেশের সীমান্ত আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। আমরা বার বারই ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে এটা জানিয়েছি।’



