লবণ আমদানির খবরে দিশেহারা কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় লবণ চাষি ও শ্রমিকরা

চলতি মৌসুমের শুরুতে বিদেশ থেকে লবণ আমদানীর খবর পেয়ে মহেশখালী, চকরিয়া, কুতুবদিয়া, ঈদগাহ, পেকুয়া ও জেলা সদরের লবণ চাষিরা লবণ আমদানীর বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশে নেমেছেন।

রফিক আহমদ, চকরিয়া (কক্সবাজার)

Location :

Chakaria
লবণ চাষের জমি
লবণ চাষের জমি |নয়া দিগন্ত

চলতি লবণ উৎপাদন মৌসুমের শুরুতে লবণ মিল মালিক ও সংশ্লিষ্ট আমলাদের কারসাজির মাধ্যমে বিদেশ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন লবণ আমদানীর সিদ্ধান্তের খবরে কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার লবণ চাষি ও শ্রমিকরা হতাশ হয়ে পড়েছে এবং তাদের চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

জানা যায়, গত বছর লবণ শিল্পের নামে বন্ড সুবিধায় বিভিন্ন সংস্থা লবণ আমদানি করে সুকৌশলে বিভিন্ন মিলে বিক্রি করায় গত মৌসুমে উৎপাদিত লবণের মূল্য কমে যায়। এতে দেশীয় এ লবণ শিল্প মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে এবং চাষিরাও গত মৌসুমে উৎপাদিত লবণের কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় দায়গ্রস্ত হয়ে পড়ে ।

এদিকে, চলতি মৌসুমের শুরুতে বিদেশ থেকে লবণ আমদানীর খবর পেয়ে মহেশখালী, চকরিয়া, কুতুবদিয়া, ঈদগাহ, পেকুয়া ও জেলা সদরের লবণ চাষিরা লবণ আমদানীর বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশে নেমেছেন।

সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, বদরখালী উপকূলীয় অঞ্চলে গত মৌসুমে উৎপাদিত লবণের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় এ অঞ্চলের লক্ষাধিক লবণ চাষি আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। যার ফলে মৌসুমে শুরু হলেও এখনো অধিকাংশ লবণ চাষিরা লবণ উৎপাদনে মাঠে নামতে সাহস পাচ্ছেন না। প্রতিবছর অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি বা নভেম্বর মাসের শুরুতে এলাকার লবণ চাষিরা লবণ উৎপাদনে মাঠে নামেন।

কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় অঞ্চলের উৎপাদিত লবণ থেকে প্রতি বছর দেশের চাহিদার সিংহভাগ পুরোন করে আরো উদ্বৃত্ত থেকে যায়। এ জেলায় প্রতিবছর লক্ষ্যমাত্রার অধিক লবণ উৎপাদিত হয়। অথচ চলতি মৌসুম শুরু হলেও চকরিয়া, মহেশখালী, জেলা সদর উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ লবণ মাঠ এখনো খালী পড়ে রয়েছে। এলাকার লবণ চাষিরা বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে ও জমি বর্গা করে চাষে নামতে গিয়ে চরম উদ্বেগ আতঙ্কে ভুগছেন।

এদিকে লবণ উৎপাদনের মৌসুমের শুরুতে আবারো সোডিয়াম সালফেট শিল্প-কারখানার জন্য বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করতে ইতোমধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছেন বিসিক। এ খবর মাঠপর্যায়ে লবণ চাষিরা জানতে পেরে লবণ উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। যার ফলে চলতি মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত লবণে দাম না পাবার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় চাষিরা।

কক্সবাজার লবণ চাষি ও ব্যবসায়ী সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ও চকরিয়া মাতামুহুরী সাংগঠনিক উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামিল ইব্রাহিম চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, ‘গত মৌসুমের চার লাখ মেট্রিক টনের বেশি লবণ এখনো মাঠে মজুদ থাকা অবস্থায় সরকার নতুন করে এক লাখ মেট্রিক টন লবণ আমদানির পরিকল্পনা নিয়েছে।’

এতে উৎপাদন মৌসুম শুরু হলেও আগেকার বছরগুলোর মতো ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার শঙ্কায় লবণ চাষিরা লবণ উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছে বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে দেশে ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টনের চাহিদার বিপরীতে লবণ উৎপাদন হয়েছিল ২২ লাখ ৫১ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন। এর আগের মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল ২৪ লাখ ৩৭ হাজার ৮৯০ মেট্রিক টন। চাহিদা পূরণে ঘাটতি থাকলেও মৌসুম শেষের ছয় মাসের চাহিদা পুরোন পরেও ৪ লাখ ২০৩ টন লবণ বিক্রিত অবস্থায় এখনো মাঠেই পড়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লবণ চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

কক্সবাজার জেলার বিসিক সূত্রে জানা গেছে, চকরিয়া উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের পশ্চিম বড়ভেওলা, দরবেশকাটা, বদরখালী, ঢেমুশিয়া, রামপুর, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী ইউনিয়নের ছয়টি বড় মোকামসহ কক্সবাজারের সাত উপজেলা মিলিয়ে ৫৯ হাজার ৯৯৯ একর এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও পটিয়া উপজেলার (আংশিক) ১০ হাজার ৮৯ একর জমিতে প্রতিবছর লবণ চাষ হয়ে থাকে। দেশে উৎপাদিত মোট লবণের ৮৭ শতাংশই উৎপাদন হয় কক্সবাজারের সাতটি উপজেলায়।

চকরিয়ার উপকূলীয় বদরখালীর লবণ ব্যবসায়ীর নেতা নবী হোসেন বলেন, ‘চলতি মৌসুমের শুরুতে লবণ আমদানীর সিদ্ধান্ত বন্ধ রেখে দেশীয় এ লবণ শিল্প বাছানোর জন্য স্থানীয় চাষিরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রাণালয়ের কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেও কোনো সুফল পায়নি।’

কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে মজুদ লবণের তথ্য না নিয়ে এক তরফা ভাবে লবণ আমদানীর সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন বলে চাষিরা জানান।

এদিকে যেখানে এক মণ লবণ উৎপাদন করতে খরছ পড়ে ৩০০ টাকারও বেশি সেখানে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৪০ টাকায় মণ। এতে করে চাষিরা প্রতিনিয়ত লোকসান গুণতে হচ্ছে। প্রতিবছর এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশীয় লবণ শিল্প অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বেকার হয়ে পড়বে লবণ উৎপাদন ও পরিবহন, গুদামজাত ও বিক্রির সাথে জড়িত এলাকায় কয়েক লাখ মানুষ।

কক্সবাজার লবণ চাষি ও ব্যবসায়ী সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বলছেন, শিল্প-কারখানা ও কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দিতে মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতিবছর বিদেশ থেকে লবণ আমদানি জিইয়ে রেখেছে। এ সিন্ডিকেট চক্রের এমন কারসাজির কারণে প্রতিবছর দেশীয় লবণ উৎপাদনে জড়িত স্থানীয় চাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও অযৌক্তিকভাবে আমদানির অনুমতি দিলে দেশীয় লবণ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে এবং দেশীয় লবণের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ধরে রাখতে হলে সরকারকে চাষিদের জন্য কার্যকর প্রণোদনা দিতে হবে। জমির ভাড়া, সেচ ব্যবস্থা ও শ্রমিকের পেছনে বড় অংকের টাকা ব্যয় হওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। তাই আমদানির পরিকল্পনা বাতিল করে স্থানীয় চাষির কাছ থেকে লবণ সংগ্রহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছেন তারা।