বরগুনার তালতলী উপজেলার ৯টি খাল খনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ প্রকল্পের আওতায় খাল খননের নামে দায়সারা কাজ করে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা চলছে। এমনকি অনিয়ম আড়াল করতে কাজ শেষ হওয়ার আগেই খালের বাঁধ কেটে পানি প্রবেশ করানো হচ্ছে।
অভিযোগের তীর নিশানবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: কামরুজ্জামান বাচ্চুর বিরুদ্ধে। স্থানীয়রা জানান, সমবায়ের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের কথা থাকলেও চেয়ারম্যান নিজ লোকজন দিয়ে ভেকু মেশিন দিয়ে খনন কাজ করাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পে মোট ১৭ হাজার ৫৫২.৫ মিটার খাল খননের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮৩ টাকা। খনন কাজ চলা খালগুলো হলো নলবুনিয়া খাল, চিলু মাঝির খাল, সুন্দরিয়া খাল, সুন্দরিয়া ব্রাঞ্চ খাল, তাঁতীপাড়া খাল, চামোপাড়া খাল, মৌরাবির খাল, বথিপাড়া খাল এবং পাওয়াপাড়া-মোয়াপাড়া খাল—এই ৯টি খাল খননে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নামমাত্র মাটি কেটে খালের দুই পাড় সামান্য পরিষ্কার করা হচ্ছে, কিন্তু গভীরতা বাড়ানো হচ্ছে না। একদিকে খনন কাজ চলছে, অন্যদিকে বাঁধ কেটে খালে পানি ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে প্রকৃত কাজ কতটুকু হয়েছে তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পুরো প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করছে। তারাই ঠিকাদার, তারাই সমিতির সভাপতি-সম্পাদক, আবার তারাই বরাদ্দ উত্তোলনে স্বাক্ষর করছে। এছাড়া প্রকল্পের ২৫ শতাংশ অর্থ ঘুষ হিসেবে বিভিন্ন দপ্তরে দিতে হয়—এমন অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তাঁতীপাড়া, চামোপাড়া, মৌরাবির, বথিপাড়া ও পাওয়াপাড়া-মোয়াপাড়া এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ভেকু মেশিনে খনন চলছে। তবে তদারকিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল দপ্তরের কাউকে দেখা যায়নি।
বথিপাড়া খালের পাড়ের বাসিন্দা হাবিব হাওলাদার, মো: মুছা, আব্দুল খালেক ও আব্দুল মান্নান বলেন, “এভাবে খাল খনন করলে কৃষকদের কোনো উপকার হবে না। বর্ষা এলেই পাড় ভেঙে খাল ভরাট হয়ে যাবে।”
ভেকু মেশিন চালক ইউসুফ জানান, চেয়ারম্যানের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করছেন। তিনি স্বীকার করেন, খননের পাশাপাশি বাঁধ কেটে পানি প্রবেশ করানো হচ্ছে।
প্যানেল চেয়ারম্যান মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, চেয়ারম্যানের নির্দেশেই কাজ করছেন। তবে কাজ শেষ না হতেই বাঁধ কাটার বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
চেয়ারম্যান মো: কামরুজ্জামান বাচ্চু দাবি করেন, সঠিক নিয়মেই কাজ হচ্ছে এবং কোনো অনিয়ম থাকলে তা সংশোধন করা হবে।
তালতলী উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী মো: সাখাওয়াত হোসেন জানান, এখন পর্যন্ত ৫০% বিল পরিশোধ হয়েছে। বাঁধ কাটার বিষয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় কৃষকরা পানি চলাচলের সুবিধার্থে তা করেছেন।
বরগুনা নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মেহেদী হাসান ঘুষের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অনিয়মের বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
প্রকল্প পরিচালক এনামুল কবির বলেন, একটি অনিয়মের বিষয়ে তিনি অবগত আছেন এবং সেখানে কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। দ্রুত কনসালটেন্ট পাঠিয়ে কাজ তদারকি করা হবে।
উপকারভোগী ও স্থানীয়রা দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দায়সারা কাজের ফলে অল্প সময়েই খাল ভরাট হয়ে যাবে এবং সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হবে।



