মেশিন বিকলের অজুহাতে ১১ বছর বন্ধ মমেকের রেডিওথেরাপি সেবা

২০১৫ সালে রেডিওথেরাপি বিভাগের মেশিন বিকল হয়ে যায়। এরপর আর সেটি সচল করা হয়নি। নতুন ক্যান্সার ইনস্টিটিউট চালুর পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Mymensingh
রেডিওথেরাপী বিভাগ
রেডিওথেরাপী বিভাগ |নয়া দিগন্ত

মেশিন বিকলের অজুহাতে টানা ১১ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের রেডিওথেরাপি সেবা। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে হাজার হাজার ক্যান্সার রোগী বাধ্য হয়েছেন চিকিৎসার জন্য ঢাকার দ্বারস্থ হতে। এতে একদিকে যেমন বেড়েছে চিকিৎসা ব্যয়, অন্যদিকে সময়মতো রেডিওথেরাপি না পাওয়ায় অনেক রোগীর জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি বিভাগ কীভাবে অচল পড়ে থাকে, আর সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা কোথায়?

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে রেডিওথেরাপি বিভাগের মেশিন বিকল হয়ে যায়। এরপর আর সেটি সচল করা হয়নি। নতুন ক্যান্সার ইনস্টিটিউট চালুর পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ক্যান্সার রোগীদের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে রাজধানীর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরপাড়া এলাকার ক্যান্সার রোগী সুফিয়া বেগমের স্বামী সজল আলী বলেন, ‘স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য চারবার ঢাকায় নিতে হয়েছে। প্রতিবার যাতায়াত, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গরিব মানুষের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা অত্যন্ত কষ্টকর।’

একই চিত্র মুক্তাগাছা উপজেলার রায়খোলা এলাকার বাসিন্দা রায়হানের পরিবারেও। তিনি জানান, বাবার ক্যান্সারের চিকিৎসার খরচ জোগাতে পরিবারের ছয়টি গরু বিক্রি করতে হয়েছে। এখন মায়েরও রেডিওথেরাপি প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে নেয়া তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, ক্যান্সারের অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রেডিওথেরাপি অত্যন্ত জরুরি। সময়মতো এই চিকিৎসা না পেলে রোগের জটিলতা বাড়ে এবং সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।

রেডিওথেরাপি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে বিভাগটি চালুর পর প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী সেবা নিতেন। পরে রোগীর সংখ্যা বেড়ে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ জন বহির্বিভাগে আসতেন। তাদের মধ্যে প্রতিদিন আট থেকে ২০ জনের রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হতো। বর্তমানে এসব রোগীকেই চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে।

রেডিওথেরাপি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা: আহমেদ জাবির বলেন, ‘প্রায় ১১ বছর ধরে বিভাগটি অচল থাকায় রোগীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। ৭০০ শয্যার ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের ১৩ তলা ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। পূর্ত বিভাগের কাজ সম্পন্ন হলে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করে রেডিওথেরাপিসহ আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসা চালু করা সম্ভব হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘২০২১ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৩ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন হলে ময়মনসিংহ বিভাগের মানুষকে আর চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হতে হবে না।’

মমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা: জাকির হোসেন বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। তবে কাজ দ্রুত শেষ করে রোগীদের পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।’

এদিকে, দীর্ঘ ১১ বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সেবা বন্ধ থাকলেও কেন বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, কেন বিকল যন্ত্র মেরামত বা প্রতিস্থাপনে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি—এসব প্রশ্ন এখন রোগী ও স্বজনদের মুখে মুখে। তাদের দাবি, প্রতিশ্রুতি নয়, দ্রুত রেডিওথেরাপি সেবা চালু করে ক্যান্সার রোগীদের দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে হবে।