ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে জমে উঠেছে ময়মনসিংহ নগরীর ঈদবাজার। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নগরীর বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে শহরের প্রধান সড়কগুলোতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন ক্রেতা ও নগরবাসী।
ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, নগরীর দুই শতাধিক বিপণিবিতানে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার ঈদসামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। রমজানের শুরু থেকে ঈদের চাঁদরাত পর্যন্ত মোট লেনদেন ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছেন তারা।
নগরীর অন্যতম বিপণিবিতান বারী প্লাজা মার্কেট। বারী প্লাজা মালিক সমিতির সভাপতি লিটন আহমেদ জানান, এই মার্কেটে ৮০টি দোকান রয়েছে। ঈদ উপলক্ষে প্রতিটি দোকানে দিনে গড়ে প্রায় এক লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হচ্ছে। সে হিসেবে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকার বেচাকেনা হচ্ছে এখানে।
ঈদের কেনাকাটার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা স্টেশন রোড। এখানে প্রায় এক হাজার দোকান রয়েছে। স্টেশন রোড দোকান মালিক সমিতির সভাপতি দিদার ইসলাম জানান, বড় দোকানগুলোতে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার ঈদসামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ৩০০ থেকে ৪০০টি ছোট দোকানে প্রতিদিন ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হচ্ছে।
এই এলাকায় অবস্থিত বড় দু’টি শপিংমল সূচনা ও পালিকা মার্কেটে রয়েছে তিন শতাধিক দোকান। রমজানের শুরু থেকেই এই এলাকার ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করছেন। ২৫ রমজানের পর থেকে বিক্রি আরো বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
ছেলেদের পোশাকের জন্য পরিচিত নগরীর হক মার্কেটেও চলছে ঈদবাজার। এই মার্কেটে ৪৭টি দোকান রয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিটি দোকানে দিনে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার বেচাকেনা হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার এখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি বাজার। হক মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন পাপ্পু বলেন, ‘বরাবরই মেয়েদের ঈদবাজার বেশি চাঙ্গা থাকে। ২৭ রমজানের পর থেকে বিক্রি বাড়বে বলে আশা করছি।’
নগরীতে ৬০ থেকে ৭০টি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শোরুম রয়েছে। উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের কেনাকাটার অন্যতম গন্তব্য এসব শোরুম। ছোট শোরুমে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন লাখ টাকা এবং বড় ব্র্যান্ডের শোরুমে আট থেকে ১০ লাখ টাকার ঈদসামগ্রী বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঈদকে সামনে রেখে প্রসাধনীর দোকানগুলোতেও ভিড় বেড়েছে। নগরীর চকবাজার ও গাঙ্গিনারপাড় এলাকার বিভিন্ন কসমেটিকস দোকানে ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ময়মনসিংহ কসমেটিকস দোকান মালিক সমিতির সভাপতি কাজী নজরুল ইসলাম জানান, সমিতির আওতাভুক্ত নগরীতে ১০৪টি দোকান রয়েছে। এসব দোকানে ঈদ মৌসুমে প্রতিদিন ১০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার প্রসাধনী বিক্রি হচ্ছে।
নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ জেলা থেকেও প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ঈদের কেনাকাটার জন্য ময়মনসিংহে আসছেন। এতে শহরের অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক পর্যন্ত মানুষের চাপ বাড়ছে। প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন লাখ মানুষ কেনাকাটার জন্য শহরে প্রবেশ করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গাঙ্গিনারপাড়, স্টেশন রোড, চরপাড়া ও নতুন বাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের স্রোত অব্যাহত রয়েছে। ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় শপিংমল, কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই।
নগরীর একটি বড় শপিংমলের সিকিউরিটি ইনচার্জ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সকাল ১০টার পর থেকেই ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। নারী ও শিশুদের সংখ্যাই বেশি। ইফতারের পর এই ভিড় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তখন ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়।’
তবে এবারের ঈদবাজারে দামের বিষয়টি নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। অনেকের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় পোশাকের দাম ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি রাখা হচ্ছে।
ফুলপুর থেকে আসা ক্রেতা সামিয়া আক্তার বলেন, ‘পোশাকের দাম কিছুটা বেশি মনে হলেও নতুন কালেকশন ভালো। অনেক খুঁজে একটি থ্রিপিস কিনেছি। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ হাজার টাকার কেনাকাটা করেছি।’
এদিকে, ঈদের কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহের ট্রাফিক ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। প্রতিদিন অতিরিক্ত দুই থেকে তিন লাখ মানুষের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে শহরের সড়কগুলো। গাঙ্গিনারপাড় থেকে চরপাড়া কিংবা টাউন হল থেকে ব্রিজ মোড়, মাত্র দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে এক থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগছে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার আধিক্য ও যত্রতত্র পার্কিং পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
স্কুলশিক্ষক কামরুল হাসান বলেন, ‘পরিবার নিয়ে বের হয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হয়েছে। এই গরমে যানজটের কারণে কেনাকাটার আনন্দটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
নগরবাসীর অভিযোগ, শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ নেই এবং অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
তবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, ঈদকে সামনে রেখে নগরীতে নিরাপত্তা ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।



