পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি মানেই শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা স্বস্তির খোঁজ। আর সেই খোঁজেই ঈদের দিন সকাল থেকেই স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের ঢল নেমেছে চায়ের রাজধানী খ্যাত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে।
সবুজ চা-বাগান, পাহাড়ি টিলা, সংরক্ষিত বনভূমি ও নির্মল পরিবেশের কারণে এ অঞ্চল এখন ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
ঈদের ছুটি শুরু হতেই শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের পর্যটন স্পটগুলোতে দেখা গেছে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব কিংবা সহকর্মীদের নিয়ে দল বেঁধে ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। কেউ চা-বাগানের সবুজে হারিয়ে যাচ্ছেন, কেউ আবার বনের গভীরে পাখির ডাক শুনে খুঁজে নিচ্ছেন ভিন্ন এক প্রশান্তি।
বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, সাতরঙা চায়ের দোকান, বধ্যভূমি-৭১ পার্ক ও বিভিন্ন চা-বাগান এলাকায় পর্যটকদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। সকালে মেঘলা আকাশ ভেদ করে সূর্যোদয়ের দৃশ্য, বিকেলে টিলার ওপর দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত উপভোগ কিংবা সবুজ চা বাগানে রঙিন পোশাকে ছবি তোলা, সব মিলিয়ে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কসহ পুরো এলাকাজুড়ে সেজে ওঠে প্রকৃতির এক অপূর্ব রূপে।
পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলোতে আগেই নেয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। অধিকাংশ আবাসনেই ঈদের আগেই শতভাগ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবার মান নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনও তৎপর রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের সময়টাতে পর্যটকদের ভিড় তাদের ব্যবসায় নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। রেস্তোরাঁ, পরিবহন, গাইড ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসাসহ নানা খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়ে। ফলে এই মৌসুমটি স্থানীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রমজানের পুরো মাস চায়ের এ জনপদ প্রায় পর্যটকশূন্য থাকলেও ঈদের দিন থেকে ভ্রমপিপাসুদের পদচারণায় আবারো মুখরিত হয়ে উঠেছে বিস্তৃর্ণ চা-বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, বধ্যভূমি-৭১ পার্ক, রাধানগর পর্যটন গ্রামসহ শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন পর্যটন স্পট।
অন্যদিকে পর্যটকরা জানান, ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ও ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের মতো নিরিবিলি ও সবুজে ঘেরা এলাকায় ছুটে এসেছেন। এখানে এসে তারা যেমন ঘন সবুজ অরণ্যের স্নিগ্ধতায় প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে পারছেন, তেমনি পরিবার-পরিজনের সাথে কাটাতে পারছেন নির্মল আনন্দঘন সময়। বিশেষ করে শিশু ও তরুণ-তরুণীদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি এই পরিবেশকে আরো প্রাণবন্ত ও রঙিন করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে ঈদের ছুটিতে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের সকল দর্শনীয় স্থান এখন এক প্রাণবন্ত পর্যটন নগরীতে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় মোড়া এই অঞ্চল যেন প্রতি বছরই নতুন করে আহ্বান জানায় কোলাহল ছেড়ে শান্তির খোঁজে আসুন সবুজের কাছে।
বেড়াতে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি থানা পুলিশ ও শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জের উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। এছাড়া অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তৎপর রয়েছে বলে জানা গেছে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির কোষাধ্যক্ষ জনক দেববর্মা বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। বনের পরিবেশ রক্ষা এবং পর্যটকদের সেবা দিতে বনকর্মী ও সিপিজি সদস্যরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন। এতে স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসাও প্রাণ ফিরে পেয়েছে।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: কামরুল হোসেন চৌধুরী রোববার (২২ মার্চ) দুপুর আড়াইটার দিকে নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘প্রতিটি স্পটে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় থাকায় ঈদের ছুটিতে তাদের নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রে ট্যুরিস্ট পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া থানা পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ ও ঈদ উৎসব নির্ভিঘ্নে পালনের লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।’



