জুলাইযোদ্ধা জুনায়েদ

সেদিনের কথা মনে হলেই থরথর করে কাঁপে শরীর

এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত আজও যেন দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে মাহবুবুল আলম জুনায়েদের জীবনে। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে গুলির শব্দ, চারদিকে ছুটে চলা মানুষ, রক্তে লাল হয়ে যাওয়া মহাসড়ক আর মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার ভয়াল স্মৃতি।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Mymensingh
জুলাইযোদ্ধা জুনায়েদ
জুলাইযোদ্ধা জুনায়েদ |নয়া দিগন্ত

এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত আজও যেন দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে মাহবুবুল আলম জুনায়েদের জীবনে। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে গুলির শব্দ, চারদিকে ছুটে চলা মানুষ, রক্তে লাল হয়ে যাওয়া মহাসড়ক আর মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার ভয়াল স্মৃতি।

তিনি বলেন, ‘সেদিনের কথা মনে হলেই শরীর থরথর করে কাঁপে। মনে হয়, আবারো যেন সেই রণক্ষেত্রে ফিরে গেছি।’

ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার রামগোপালপুর ইউনিয়নের গুজিখাঁ গ্রামের আব্দুল মালেক ও ঝরনা বেগম দম্পতির বড় ছেলে মাহবুবুল আলম জুনায়েদ। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন তিনি। সহযোদ্ধারা তাকে মৃত ভেবেই হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরেন তিনি।

জুনায়েদ জানান, সেদিন গৌরীপুরের কলতাপাড়া এলাকায় ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলছিল। আন্দোলনের চাপে পুলিশ প্রথমে পিছু হটে স্পিনিং মিলের ভেতর ও গৌরীপুর-কলতাপাড়া সড়কে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়।

তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমরা সামনে এগোচ্ছিলাম। চারদিকে শুধু স্লোগান— ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘সারা বাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে’, ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরো দেবো রক্ত’। হঠাৎ পুলিশ গুলি ছোড়া শুরু করে। আমার সামনেই জোবায়ের ভাই মাটিতে পড়ে যান। আমি পেছনে ফিরতেই অনুভব করি, একটি গুলি বুকের বাম পাশ দিয়ে ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। মনে হয়েছিল বুকটা যেন ছিঁড়ে উড়ে গেছে। এরপর আর কিছু মনে নেই।’

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রক্তাক্ত জুনায়েদকে স্থানীয়রা মাহেন্দ্র গাড়িতে করে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। টানা তিন দিন তিনি অচেতন ছিলেন। জ্ঞান ফেরার পর তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসেন তিনি।

জুনায়েদ বলেন, ‘আমি তখন কার্যত মৃতই ছিলাম। হাসপাতালেও অনেকেই ধরে নিয়েছিল আমি বেঁচে নেই। আমার পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী— সবাই শুনেছিল আমি মারা গেছি। পরে যখন সুস্থ হয়ে ফিরলাম, তখন অনেকেই আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে। বন্ধুরা বলেছে, তোকে আবার বুকে ফিরে পাব, এটা কখনো ভাবিনি।’

সেদিনের সংঘর্ষে জুনায়েদের তিন সহযোদ্ধা প্রাণ হারান। তারা হলেন ডৌহাখলা ইউনিয়নের চুড়ালী গ্রামের বিপ্লব হাসান, মইলাকান্দা পূর্বকাউরাট গ্রামের জোবায়ের আহমেদ এবং রামগোপালপুর ইউনিয়নের দামগাঁও গ্রামের নুরে আলম সিদ্দিকী রাকিব।

জুনায়েদের ভাষায়, আন্দোলনে নামার উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো। তিনি বলেন, ‘আমরা মেধার মূল্যায়নের দাবিতে আন্দোলন করেছি। চাই, যোগ্যতার ভিত্তিতে সবাই সমান সুযোগ পাক। আমিও আমার মেধার ভিত্তিতেই একদিন সরকারি চাকরি করতে চাই।’

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ পেরিয়ে এক বছর পরও বুকের ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। শরীরে গুলির সেই নির্মম স্মৃতি আর মনে রক্তাক্ত ২০ জুলাইয়ের বিভীষিকা বহন করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন এই জুলাইযোদ্ধা। তবে তার বিশ্বাস, সেই আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস একদিন নতুন প্রজন্মকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস জোগাবে।