কোরবানির দিনে দেশের প্রতিটি ঘরে যখন আনন্দ-উৎসবে মুখর, তখন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার কলাবাড়িয়া গ্রামের ভ্যানচালক শফিকুল তালুকদারের বাড়িতে ছিল নিস্তব্ধতা আর বোবা কান্না। বাড়ির আঙিনায় অসহায়ের মতো বসে থাকা তার দুই বছরের মেয়ে নুসরাতের একটাই প্রশ্ন, 'আমার আব্বু কই মা?' আর সেই প্রশ্ন যেন ভেদ করে দিচ্ছিল চারপাশের স্তব্ধতা।
ঈদের মাত্র দুই দিন আগে কারাগারে পাঠানো হয় তার বাবা শফিকুল তালুকদারকে। তার অপরাধ অজান্তে কিছু সরকারি পাঠ্যবই একটি ভাঙ্গারির গোডাউনে পৌঁছে দিয়েছিলেন। অথচ যিনি বই কিনেছেন সেই ভাঙারি গোডাউনের মালিক মজিবর বেপারীকে কোনো শাস্তি দেয়া হয়নি। কারণ তার হয়ে ঝালকাঠির বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) কাওছার হোসেন ইউএনওকে ফোন দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মজিবর বেপারী কাওছার হোসেনকে নিজের ভাই বলে পরিচয় দিয়েছেন।
ঈদের বিকেলে সরেজমিনে কলাবাড়িয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় শফিকুলের ঘরজুড়ে শুধু হাহাকার। বাড়ির উঠানে বসে নিঃশব্দে কাঁদছেন শফিকুলের স্ত্রী লামিয়া বেগম পাশে চুপচাপ বসে আছে কন্যাশিশু নুসরাত। লামিয়া কান্না চাপতে না পেরে শুধু বললেন, 'চার মাস আগে চোরে আগের ভ্যানটা নিয়ে গেল। কিস্তি তুলে নতুন একটা ভ্যান নিছিল। এখনো গত সপ্তাহের কিস্তিডাও দিতে পারি নাই। তিনদিন ধরে ঘরে খাবার নাই, মেয়ের মুখেও কিছু দিতে পারি নাই।'
কান্নায় ভেঙে পড়েন শফিকুলের মা সিমা বেগম। তিনি বলেন, 'পোলাডা না খাইয়া থাকে কিন্তু অন্যায় করে না। তবুও আজ ঈদের দিন আমার পোলাডা জেলের ভিতরে...।'
পাশেই বাবা মন্নান তালুকদার চোখ মুছতে মুছতে বলেন, 'শফিকুল তো জানেই না, বই নিলে এমন কড়া শাস্তি হয়। জানলে কি যাইতো?'
প্রতিবেশী আবুল কাশেম খলিফা জানান, শফিকুল খুব অসহায় ঋণ করে একটা ভ্যান কিনেছে। ও তেমন লেখাপড়াও জানে না। সরকারি বই নেওয়া যে অপরাধ, তাও জানে না।
ঘটনার শুরু ৫ জুন বৃহস্পতিবার। দুপুর ২টার দিকে নিজ ঘরে খাবার খেতে বসেছিলেন শফিকুল। পিঙ্গলাকাঠী এলাকার ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী সুজন বেপারী শফিকুলকে ফোন দিয়ে কাসেমাবাদ হেলিপ্যাড সংলগ্ন মেসার্স মদিনা স্টোর নামের মজিবর বেপারীর ভাঙ্গারির গেডাউনে কিছু ভাঙ্গারি মালামাল পৌঁছে দিতে বলেন। প্রথম দফায় ভাঙারি টিন ও সাইকেল ভাংগা পৌঁছে দেয়ার পর, দ্বিতীয় দফায় আনাম বাবুর্চির বাড়ি থেকে সরকারি পাঠ্যবইগুলো নিয়ে মজিবর বেপারীর ভাঙ্গারি গেডাউনে যায় শফিকুল।
স্থানীয়রা জানান, মজিবরের ভাঙ্গারি কারখানায় তার কর্মচারীরা বিপুল পরিমাণ নতুন বই নামাচ্ছে দেখে সাংবাদিকদের খবর দেন তারা। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ইউএনও রিফাত আরা মৌরি ও ওসি (তদন্ত) মাহবুবুর রহমান থানা পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে ভ্যানে নতুন বইসহ গোডাউন ভর্তি বিভিন্ন বছরের সরকারি পাঠ্যবইয়ের বিশাল মজুত দেখতে পান। সবার সামনেই বই গণনার নির্দেশ দেন ইউএনও। এ সময় ইউএনও'র কাছে নিজেকে এডিসি কাওছার হোসেনের ভাই হিসেবে পরিচয় দেন গোডাউনের মালিক মজিবর বেপারী। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইউএনওর সরকারি নম্বরে ফোন করেন এডিসি নিজেই।
গোডাউন ভর্তি বিপুল সরকারি বই থাকা সত্ত্বেও ইউএনও এলকাবাসী ও সাংবাদিকদের সামনেই ফোনে এডিসিকে বললেন 'ভ্যানে বই পাওয়া গেলেও গোডাউনে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি, ঠিক আছে স্যার সমস্যা নাই আমি আছি এখানে।' এরপর ভ্যানচালক শফিকুলকে প্রাথমিকভাবে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেন ইউএনও।
অভিযোগ রয়েছে, ভ্যানে থাকা বই জব্দ করা হলেও গোডাউনে থাকা বিপুল বই অপ্রকাশিত ও অরক্ষিতই থেকে যায় এবং গোডাউন মালিক মজিবর বেপারীর বিরুদ্ধেও কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
পরদিন শুক্রবার (৬ জুন) সকালেই পাল্টে যায় তদন্তের মোড়। ভ্যানচালক শফিকুল, বই বিক্রেতা সুজন ও এক মাদরাসা কর্মচারী সাগর হোসেনকে আসামি করে থানায় মামলা হয়। তবে যেখানে আসামি হিসেবে জায়গা পাননি মূল অভিযুক্ত মজিবর বেপারী।
ভাঙ্গারী ব্যবসায়ী মজিবর বেপারী বলেন, 'ইউএনও স্যার আসলে আমি আমার ভাই কাওছারকে (এডিসি) ফোন করি। পরে ইউএনও'র সাথে কথা বলেন। বইগুলো আমার না, গোডাউনে বই ছিল না। কেউ রাস্তা দিয়ে বই নিয়ে গেলে তার দায় আমার নয়।'
গোডাউনে অনেক পাঠ্যবই ছিল উল্লেখ করে প্রত্যক্ষদর্শী গৌরনদী মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মাহবুবুর রহমান বলেন, ঘটনাস্থলে ইউএনও স্যার এবং অন্যান্য সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। আমি নির্বাহী কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করেছি।'
ইউএনও রিফাত আরা মৌরি বলেন, 'গোডাউন সার্চে পুরাতন কিছু বই পাওয়া গেলেও এ বছরের নতুন বই পাওয়া যায়নি। তবে ভ্যান থেকে এ বছরের কিছু নতুন বই জব্দ করা হয়েছে তাই ভ্যানচালককে আসামি করে পুলিশ মামলা করেছে। পরবর্তীতে তার জবানবন্দী অনুযায়ী তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে একজন এডিসি'র ভাই হওয়ায় স্বজনপ্রীতি করে ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীকে রক্ষার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বরিশাল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনের কাছে এ বিষয়ে মোবাইলে জানতে চাইলে তিনি বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং ইউএনওর সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
ঝালকাঠি জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) কাওছার হোসেন বলেন, তিনি (মজিবর) আমার প্রতিবেশী বড় ভাই। আমি বিষয়টি জানার জন্য ফোন দিয়েছিলাম। তদবিরের জন্য ফোন দেইনি।



