ছবি ভাইরাল

রংপুরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে প্রবেশ করে মব ও নাশকতা তৈরির চেষ্টা ছাত্রলীগের

‘২৪ বিপ্লবে শহীদ হওয়া আমার ভাইবোনদের রক্তের সাথে প্রতিজ্ঞা করে বলছি, রংপুরের মাটিতে এভাবে আর কখনো ফ্যাসিস্ট কোন শক্তি দাড়ানোর সাহস দেখালে পুলিশ প্রশাসন কে লাগবে না, আমি লড়বো তাদের বিপক্ষে ইনশাআল্লাহ।’

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো

Location :

Rangpur
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সামনে সারিতে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ নেতাদের অংশগ্রহণ
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সামনে সারিতে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ নেতাদের অংশগ্রহণ |সংগৃহীত

ঢাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় রংপুরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সামনে সারিতে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ নেতাদের অংশগ্রহণ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। এখন পর্যন্ত পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, ঠাকুরগাঁও ও রাজশাহী জেলা থেকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কয়েকটি গ্রুপ রংপুরে এসে আন্দোলনের ভেতরে ঢুকে পড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

মাইলস্টোন ট্রাজেডি ইস্যুতে বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) রংপুর মহানগরীতে আন্দোলন ঘোষণা করে শিক্ষার্থীরা। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মহানগরীর কাচারী বাজারের ট্রাফিক পুলিশ বক্সের ভিতরে একজন কাফনের পরে দাঁড়িয়ে যান। তাতে এক হাতে উচিয়ে লেখা ছিল লাল প্ল্যাকার্ডে বিচার। অপর হাতে নিচু করে তাতে দাঁড়িপাল্লার এক পাশে একটি কফিন আরেক পাশে টাকা ও পিস্তল। এনিয়ে তোলপাড় তৈরি হয় নগরীতে।

ওই ছবিটি ফেসবুকে শেয়ার করে একটি পোস্ট দেন রংপুর মহানগর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি। ওই পোস্টে ইমতি লেখেন ‘একটু আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এর স*ন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা এভাবেই দাড়িয়েছিলো রংপুর ডিসি অফিসের সামনে, এত নরকীয় হত্যাকাণ্ড চালানোর পরেও যাদের মাঝে বিন্দু পরিমাণ অনুশোচনা বোধটুকু নেই। তারা আসছে বিচারের নামে প্রপাগাণ্ডা চালাতে। ১০ মিনিট দাঁড়ায় থাকার হ্যাডাম হইলো না?’

ইমতি লেখেন, ‘২৪ বিপ্লবে শহীদ হওয়া আমার ভাইবোনদের রক্তের সাথে প্রতিজ্ঞা করে বলছি, রংপুরের মাটিতে এভাবে আর কখনো ফ্যাসিস্ট কোন শক্তি দাড়ানোর সাহস দেখালে পুলিশ প্রশাসন কে লাগবে না, আমি লড়বো তাদের বিপক্ষে ইনশাআল্লাহ। বিশ্বাস রাখি, রংপুরের বিপ্লবী ছাত্র-জনতা পাশে থাকবে এবং তাদের সমূলে প্রতিহত করবে।’

পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে যিনি দাঁড়িয়েছিলেন তার নাম মোহাম্মদ তানভীর হোসেন রিদম। তিনি রাজশাহী বিশ্বিবিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছেন চলতি বছর। তার বাসা নগরীর সেনপাড়া এলাকায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে কি পদবী তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি পুলিশ।

এদিকে, শিক্ষা উপদেষ্টা ও সচিবের পদত্যাগের দাবিতে গত মঙ্গলবার (২২ জুলাই) নগরীর কাচারীবাজার এলাকায় শিক্ষা অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা অফিসের সামনে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান ও বক্তব্য দেয়।

এ প্রতিবাদ কর্মসূচির সামনের সারিতে দেখা যায় পীরগাছার অন্নদাগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বিজয়কে। আন্দোলনকারীরা জানান, এসময় আতাউর শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করতে একাধিকবার উস্কানিমূলক স্লোগান দেয় এবং শিক্ষা অফিসে মব তৈরির চেষ্টা করে। এছাড়াও এ কর্মসূচিতে থাকা অনেকেই অচেনা ছিল বলে জানান আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীরা।

ছাত্রলীগ নেতা আতাউর রহমান বিজয়ের ছবি এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এনিয়ে ক্ষুব্ধ জুলাইযোদ্ধারা। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ছবি পোস্ট করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

এ বিষয়েও ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন মহানগর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি। ওই পোস্টে ইমতি লেখেন, ‘আমার রংপুরের কোমলমতি ভাইবোনদের আন্দোলনের মাঝে ঢুকেছে ছাত্রলীগ, আপনারা সকলেই জানেন এই শোকাবহ সময়ে পুরো বিষয়টাকে নোংরাভাবে উপস্থাপন এবং দেশকে অস্থিতিশীল করতে আন্দোলনের মাঝে ঢুকেছিলো ছাত্রলীগ।’

ইমতি লেখেন, ‘রংপুরেও তাদের পরিকল্পনা ছিলো আন্দোলন উসকিয়ে দিয়ে শিক্ষা অফিস এ ভাংচুর করা। প্রশাসনের বিচক্ষণতায় সেদিন সেটি সামলানো গিয়েছে।’

‘কোনভাবেই আমরা চাই না আমাদের স্নেহের ভাইবোনদের কোন বিপদের কারণ এই সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ হোক। শিক্ষার্থীদের যেকোনো যৌক্তিক দাবিতে আমরা তাদের সাথে সামনের সারিতে থাকবো ইনশাআল্লাহ, তবে এই লীগের দেখা পেলে তাদের সাথে আর কোন আপষ হবে না।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, এরই মধ্যে রংপুরে ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগসহ আওয়া মীলীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা রংপুরে এসে অবস্থান নিয়েছে। তারা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের নাশকতা করতে পারে। সূত্রগুলো জানায়, ২২ জুলাই পীরগাছার ছাত্রলীগ নেতা আতাউর রহমান বিজয় আন্দোলনে যোগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের উস্কে মব তৈরির মাধ্যমে শিক্ষা অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত মুভমেন্ট করায় বিজয়সহ দ্রুত বেশ কয়েকজন পালিয়ে যায়।

এ ব্যাপারে রংপুর মহানগর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি বলেন, ‘এখন মাইলস্টোন ইস্যু কাজে লাগিয়ে রংপুরকে অস্থিতিশীল করতে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের অংগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা তৎপর। তারা ছদ্মবেশে অত্যন্ত কৌশলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ঢুকে পড়ছে এবং মব তৈরি করে নাশকতা তৈরির চেষ্টা করছে। তাদের গ্রেফতারে আমরা সেভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা লক্ষ করছি না।’

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ রংপুর মহানগর কমিটির মুখপাত্র (গত বছরের ১৬ জুলাই রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে গুলিবিদ্ধ আবু সাঈদকে প্রথম উদ্ধারকারী) সিয়াম আহসান আয়ান বলেন, ‘নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ পরিকল্পিতভাবে আমাদের শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে সরকার সংস্কার আন্দোলনে ডাইভার্টের অপচেষ্টা করছে। আমরা এজন্য সতর্ক অবস্থায় আছি। আইনশৃঙখলাবাহিনীকে বলবো আপনারা তৎপরত হোন। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এই অপচেষ্টা রংপুরে জিরো টলারেন্সভাবে আমরা প্রতিহত করবো।’

এ ব্যপারে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মো: মজিদ আলী জানান, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ কৌশলে ঢুকেপড়াদের ব্যাপারে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছি। তাদেরকে গ্রেফতারে চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঘিরে আমরা কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছি।’