মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সদস‍্য সচিবের বিরুদ্ধে অনাস্থা, অব‍্যাহতির দাবি

গত ৭ মার্চ এ অভিযোগ করা হয়। অভিযোগপত্রে জেলা আহ্বায়ক কমিটির ৩২ সদস্যের মধ্যে ২৬ জন স্বাক্ষর করেছেন বলে জানা গেছে।

আব্দুল আজিজ, মৌলভীবাজার

Location :

Maulvibazar
মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপন
মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপন |ফাইল ছবি

আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রশ্রয় দেয়া, মামলাবাণিজ্য, ত্রয়োদশ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেয়া, চাঁদাবাজি, সরকারি জায়গা দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।

গত ৭ মার্চ এ অভিযোগ করা হয়। অভিযোগপত্রে জেলা আহ্বায়ক কমিটির ৩২ সদস্যের মধ্যে ২৬ জন স্বাক্ষর করেছেন বলে জানা গেছে।

জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর জেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মো: ফয়জুল করিম ময়ূনকে আহ্বায়ক করে ৩২ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। তবে ওই কমিটিতে সদস্য সচিবের পদ রাখা হয়নি। পরে নতুন আহ্বায়কের স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডের কারণে মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম নাসের রহমানের অনুরোধে একজন সিনিয়র নেতাকে সদস্য সচিব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আমলে না নিয়ে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর আব্দুর রহিম রিপনকে সদস্য সচিব হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়।

কেন্দ্রের এমন সিদ্ধান্তে জেলা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা হতবাক হন। বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির ১৯ সদস্য তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বরাবর রিপনকে অব্যাহতির দাবি জানিয়ে লিখিত আবেদন করেন। এর প্রতিবাদে জেলা সদরসহ বিভিন্ন জায়গায় মিছিল ও সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়।

পরবর্তী সময়ে দলীয় অচলাবস্থা নিরসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং কেন্দ্রীয় বিএনপির সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউছের উপস্থিতিতে জেলা আহ্বায়ক কমিটির একটি সভা আহ্বান করা হয়। তবে শুরুতে ১৯ জন সদস্য এ সভা বয়কট করলেও পরে কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুরোধে সভায় অংশ নেন।

আবেদনে সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপনের বিরুদ্ধে দলীয় নিয়ম নীতি ভঙ্গ করে পদ বাগিয়ে নেয়াসহ জেলার সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ও তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে অগ্রহণযোগ্যতা এবং দ্বিমুখী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে।

আহ্বায়ক কমিটির একাধিক সদস্যের কাছ থেকে জানা যায়, আব্দুর রহিম রিপন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। তার ছোট ভাই ঢাকা উত্তরার দক্ষিণখান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হত্যা মামলার অন্যতম আসামি। রিপন এখনো আওয়ামী লীগের নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে তিনি জেলার মিনিবাস টার্মিনাল দখলে নিয়েছেন এবং এলাকায় চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মের সাথে তার সম্পৃক্ততার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, তার ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে মানুষকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে বহু মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। এতে অনেক মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষকে আসামি করে প্রচুর মামলা বাণিজ্য করেছেন। একই সাথে আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের নেতাদের পলায়নের সুযোগ করে দিয়ে তিনি বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিপন রহস্যজনক ভূমিকা পালন করেছেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি দায়িত্বে থেকেও কার্যকর ভূমিকা রাখেননি। বরং জামায়াতের সাথে সমঝোতা করে বিএনপির প্রার্থীকে হারানোর জন্য বড় অঙ্কের টাকা নেন এবং জামায়াতের অ্যাজেন্ডা অনুযায়ী কাজ করেছেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তিনি জেলার সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে ন্যূনতম সম্মান দেখাননি এবং একজনের সাথে আরেকজনের বিরোধ সৃষ্টি করে চলেছেন। এসব কারণে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক বরাবর একটি সভা আহ্বানের জন্য তারা লিখিতভাবে অনুরোধ করেন। পাশাপাশি সদস্য সচিবের বিরুদ্ধে অনাস্থার কথা মৌখিকভাবেও জানান এবং আব্দুর রহিম রিপনকে অনুপস্থিত রেখে সভা আহ্বানের অনুরোধ করেন।

তবে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম ময়ূন ও সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপনের স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে একটি সভা আহ্বানের চিঠি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। পরে ২৭ ফেব্রুয়ারি অনিবার্য কারণ দেখিয়ে ওই সভা স্থগিত করা হয়।

জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বকশী মিছবাহ উর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে কমিটিতে সদস্যসংখ্যা ৩৩, এর মধ্যে আমরা ২৬ জন দস্তখত দিয়েছি। আমি মনে করি, যেহেতু এই সদস্যসচিবের বিষয়ে সবার অনাস্থা, এখন নতুন কাউকে দায়িত্ব দেয়া হলে জেলা সংগঠনের জন‍্য ভালো হবে। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, আশা করছি দলের হাইকমান্ড এ বিষয়ে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

অভিযোগে স্বাক্ষরকারী জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোশাররফ হোসেন বাদশা বলেন, ‘নির্বাচন-পরবর্তী পর্যালোচনা সভায় আহ্বায়ক কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা দেয়া হয়। এ সভায় জেলা আহ্বায়ক উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও আসেননি।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপন জানান, ‘আমি সৌদিতে ওমরায় আছি। দেশে আসার পর কথা বলি।’

জেলা আহ্বায়ক ফয়জুল করিম ময়ুনও ওমরাহ করতে সৌদি আরবে অবস্থান করায় তার হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু একাধিকবার যোগযোগ করার পরেও তিনি রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও কোনো উত্তর দেননি।

সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গৌউছ বলেন, ‘অভিযোগ হয়তো মহাসচিবের দফতরে দেয়া হয়েছে। এখনো আমার হাতে পৌঁছায়নি।’