দীর্ঘ ২২ বছরের বহুল আলোচিত আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার চূড়ান্ত আপিল শুনানি শেষ হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আপিল বিভাগ শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। ফলে এখন সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের দিকে তাকিয়ে টঙ্গী-গাজীপুরের রাজনৈতিক অঙ্গন।
আর এ রায়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের কারাবন্দিত্ব থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিএনপি নেতা নূরুল ইসলাম সরকারের মুক্তি হবে— এ প্রত্যাশায় সরব হয়ে উঠেছেন তার সমর্থক ও স্থানীয়দের একটি অংশ।
শুনানি শেষ হওয়ার পর গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নূরুল ইসলাম সরকারের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন পোস্ট, মন্তব্য ও প্রচারণা দেখা গেছে।
নূরুল ইসলাম সরকারকে ঘিরে টঙ্গীবাসীর এই আগ্রহের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। তৎকালীন যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা ও টঙ্গীর জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা নূরুল ইসলাম সরকারকে এ মামলায় ‘হুকুমের আসামি’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তার পরিবার ও সমর্থকদের দীর্ঘদিনের দাবি, আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের দায় তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের ওপর চাপানো এবং টঙ্গীর রাজনীতিতে নূরুল ইসলাম সরকারের প্রভাব খর্ব করার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছিল।
তাদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের সময় নূরুল ইসলাম সরকার ঘটনাস্থলে ছিলেন না এবং হত্যার সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। বরং সে সময় টঙ্গীর রাজনীতিতে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক প্রভাব স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল বলে তাদের অভিযোগ।
দুই ‘নূরুল ইসলাম’—দুই রাজনৈতিক পরিচয়
এ মামলার আলোচনায় আরেকজন নূরুল ইসলাম রয়েছেন, জাতীয় পার্টির নেতা নূরুল ইসলাম দিপু। তিনি নূরুল ইসলাম সরকার নন। দিপু ২০০৪ সালে জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রসমাজের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মামলার এজাহারে তাকে ১ নম্বর আসামি করা হয়। তার ভাই শহিদুল ইসলাম শিবু ২ নম্বর আসামি এবং আরেক ভাই অহিদুল ইসলাম টিপুও আসামি হন। শিবু পরবর্তীতে কারাগারে মারা যান। হাইকোর্টে দিপু ও শিবুর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে এবং টিপুর সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়।
দিপু-শিবু-টিপুর পরিবার ও তাদের ঘনিষ্ঠদের দাবি, টঙ্গী বিসিক এলাকায় ঝুট ব্যবসা, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে তিন ভাইকে মামলায় আসামি করা হয়েছিল।
তাদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের সময় তিন ভাই ঘটনাস্থলে ছিলেন না এবং হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল না। তবে আদালতের রায়ে তাদের বিরুদ্ধে দায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তিই এখন অপেক্ষমাণ।
অন্যদিকে নূরুল ইসলাম সরকারকে আসামি করার প্রেক্ষাপট হিসেবে তার পরিবার যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলে আসছে, তার সঙ্গে দিপুদের বিরুদ্ধে আসামি করার কথিত ব্যবসায়িক-আধিপত্যের বিরোধকে এক করে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।
দুই নূরুল ইসলাম ছিলেন দুই ভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং মামলায় তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রেক্ষাপটও পৃথক - এ বিষয়টি নিয়েই টঙ্গীর রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন আলোচনা রয়েছে।
২২ বছর পর শেষ অপেক্ষা
২০০৪ সালের ৭ মে টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এক জনসভায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আহসান উল্লাহ মাস্টারকে। একই ঘটনায় নিহত হন ওমর ফারুক রতন।
পরদিন আহসান উল্লাহ মাস্টারের ভাই মতিউর রহমান মতি ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। তদন্ত শেষে ৩০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল নূরুল ইসলাম সরকারসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে ২০১৬ সালের ১৫ জুন হাইকোর্ট ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, সাতজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন দেন এবং ১১ জনকে খালাস দেন। হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ছয়জনের মধ্যে নূরুল ইসলাম সরকার ও নূরুল ইসলাম দিপুও রয়েছেন।
মামলার দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যেই নূরুল ইসলাম সরকারের মুক্তির দাবিতে টঙ্গীতে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ, সমাবেশ ও দোয়া মাহফিল করেছেন তার সমর্থকরা। কারাগারে থাকা অবস্থায় টঙ্গী পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নূরুল ইসলাম সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টিও স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচিত হয়। ওই নির্বাচনে তার ষড়যন্ত্র ও কারচুপি করে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করা হয় বলে তার সমর্থকদের দাবি।
সমর্থকদের অভিযোগ, তার জনপ্রিয়তার কারণেই তাকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় রাখার চেষ্টা হয়েছে।
নূরুল ইসলাম সরকারের ছেলে সরকার শাহনূর ইসলাম রনিও দীর্ঘদিন ধরে তার বাবাকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন। তার অভিযোগ, মামলাটি দীর্ঘায়িত করে তার বাবাকে বছরের পর বছর কারাগারে রাখা হয়েছে। হাইকোর্টে একাধিক বেঞ্চ পরিবর্তন ও মামলার দীর্ঘসূত্রতার পেছনেও তিনি বাদীপক্ষের ভূমিকার অভিযোগ করেছেন।
রনির আরো অভিযোগ, তার বাবার মালিকানাধীন একটি সিনেমা হল নিয়ে আহসান উল্লাহ মাস্টারের ভাই ও মামলাটির বাদী মতিউর রহমান মতির সঙ্গে তাদের দেওয়ানি বিরোধ ছিল।
ওই বিরোধে তাদের পক্ষে রায় থাকা সত্ত্বেও নূরুল ইসলাম সরকার কারাগারে থাকায় হলটি দখল করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মতি হলের দখল ছেড়ে চলে যান বলেও তার দাবি।
সব মিলিয়ে আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় এখন শুধু একটি পুরোনো হত্যা মামলার আইনি নিষ্পত্তিই নয়; টঙ্গীর রাজনীতিতেও এর রয়েছে ব্যাপক তাৎপর্য। বিশেষ করে নূরুল ইসলাম সরকার খালাস পেলে দীর্ঘ ২২ বছর পর তার মুক্তির পথ খুলবে— এমন প্রত্যাশায় টঙ্গীর তার সমর্থকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ।
পাশাপাশি নূরুল ইসলাম সরকার নির্দোষ প্রমান হলে এই হত্যাকান্ডে যে চারদলীয় জোট সরকারের বা রাজনৈতিক বিরোধের কোন সম্পৃক্ততা ছিল না এবং তৎকালীন সরকারি প্রেসনোটে জারি করা ‘আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকান্ড আওয়ামী লীগের দলীয় অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বের জের’ এটিই আবার প্রমাণ হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাম্প্রতিক সরব প্রচারণা তারই প্রতিফলন। শুনানি শেষ হওয়ার পর ‘নূরুল ইসলাম সরকারের মুক্তি চাই’ এমন দাবিতে বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে।
টঙ্গীর রাজনৈতিক অঙ্গনেও এখন একটাই প্রশ্ন— দীর্ঘ ২২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নূরুল ইসলাম সরকার কি এবার মুক্তি পাবেন, নাকি বহাল থাকবে তার মৃত্যুদণ্ড? সর্বোচ্চ আদালতের রায়েই মিলবে সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর।



