অক্টোবরে এলেই পানি শূন্য হয়ে পড়ে খরস্রোতা তিস্তা নদী। উজানের পানির সাথে আসা বিপুল পরিমাণ বালি ও পলিতে বালুচরে পরিণত হয়েছে তিস্তা। ফলে রংপুর বিভাগের ৩৫টি উপজেলার কয়েক লক্ষাধিক কৃষক চাষাবাদ নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন।
জানা গেছে, হিমালয় থেকে উৎপন্ন তিস্তা নদী ভারতের সিকিম, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি অতিক্রম করে লালমনিরহাটের পাটগ্রামের দহগ্রাম দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা হয়ে নদীটি ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হয়েছে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানিতে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের পর ১৯৯০ সালে সেচ প্রকল্প চালু করা হয়। এরপর গত ৩৫ বছরে তিস্তার তলদেশ ভরাট হয়ে কোথাও কোথাও দু’মিটার থেকে আড়াই মিটার উঁচু হয়ে গেছে। ফলে উজানি ঢলে বা সামান্য বৃষ্টিপাতেই প্রবল বন্যা দেখা দিচ্ছে।
তিস্তাতে বন্যায় পানি বিপদসীমা ৫২ দশমিক ৪০ থেকে বাড়িয়ে ৫২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার করা হয়েছে। পানি প্রবাহ একটু বাড়লেই দুই তীর উপচে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যা দেখা দিচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসল, ঘরবাড়ি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা।
ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ নির্মাণের পর থেকেই তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানিসঙ্কট এবং বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা এখন নিয়মিত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে।
তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, তিস্তায় প্রকল্প এলাকায় সেচ দেয়া এবং নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে ২০ হাজার কিউসেক পানি প্রয়োজন। শুধু সেচ প্রকল্পের জন্যই ১৪ হাজার কিউসেক পানি প্রয়োজন। কিন্তু মাত্র সাড়ে তিন হাজার কিউসেক পানি রয়েছে। ব্যারাজের সবকটি জলকপাট বন্ধ রেখে সেচ প্রকল্পে পানি সরবরাহ করায় নদীর ভাটিতে প্রবাহ থাকছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, একসময়ের খরস্রোতা এ নদী এখন বছরের অধিকাংশ সময় শুকনো থাকে। বর্ষায় ভাসলেও শীতে মরুভূমির মতো বালুচরে পরিণত হয়।
প্রায় ১০ বছর ধরে তিস্তা নদীর চরে হালচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন লালমনিরহাট সদর উপজেলার গোকুন্ডা ইউনিয়নের চরগোকুন্ডা গ্রামের ৫০ বছর বয়সী আক্কাস আলী। তিনি বলেন, ‘তিস্তার ভাঙনে ঘর-বাড়ি, আবাদি জমি-জমা হারিয়েছি। এখন অন্যের জমিতে হালচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে। কিন্তু এখন তিস্তা নদীতে আগের মতো পানি নেই, মাছও নেই। জেগে উঠেছে অসংখ্য চর।’
কৃষক শফিকুল ইসলাম (৪৫) বলেন, ‘তিস্তার চরে চাষাবাদে অনেক কষ্ট হচ্ছে। আগে নদীর পানি দিয়ে ফসলে সেচ দিতাম। সেই তিস্তা নদীতে পানি নেই। তেলের দাম বেশি হওয়ায় শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি সেচ দিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। চরের বালু ও মাটিতে পানি দেয়া মাত্র খেয়ে ফেলছে। খরচ বেশি হলেও তিস্তার চরে কৃষকরা ফসল ফলাচ্ছেন।’
তিস্তা নদীরক্ষা আন্দোলন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হবে। ১০ বছরের মেয়াদে দুই ধাপে এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। প্রথম ধাপে (পাঁচ বছর) ব্যয় হবে নয় হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ছয় হাজার ৭০০ কোটি টাকা আসবে চীন থেকে ঋণ হিসেবে এবং দুই হাজার ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয় হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে।
এদিকে তিস্তা বাঁচাতে গত কয়েক বছরে উত্তরাঞ্চলে ‘তিস্তা বাঁচাও, উত্তরবঙ্গ বাঁচাও’ স্লোগানে একের পর এক আন্দোলন হয়েছে। রংপুর বিভাগ জুড়ে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি ও মশাল মিছিল কর্মসূচি করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে নদীর ১১৫ কিলোমিটার জুড়ে ৪৮ ঘণ্টাব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয় মানুষ ও পরিবেশবাদীরা। তিস্তার দু’তীরে মশাল মিছিল কর্মসূচিতে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধার কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন।
অংশগ্রহণকারীদের দাবি, বাংলাদেশ-ভারত তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি এবং মাস্টারপ্ল্যান দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রস্তাবিত মাস্টারপ্ল্যানে নদী পুনঃখনন, চরবাসীর পুনর্বাসন ও বাঁধ সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিস্তা নদীরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ও বিএনপি কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ মো: আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘সরকার যদি দ্রুত নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু না করে, তবে তিস্তাপারের মানুষদের সাথে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তবে সরকার ইতোমধ্যে প্রথম ধাপের কাজ শুরু করার জন্য দুই হাজার ৪৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এখন সময় এসেছে কথা নয়, কাজ শুরুর।’
অন্যদিকে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো: সাইখুল আরিফিন জানান, তিস্তার চরাঞ্চল এখন আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। চরাঞ্চলের মাটিতে পলি জমে থাকায় অনেক উর্বর। ফলে রাসায়নিক সার ছাড়াই ভুট্টা, গম, আলু, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, বাদাম, তরমুজ, সরিষা, তিলসহ শাক-সবজি চাষ বেশি হচ্ছে। এতে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। এমনকি তিস্তার বালুচরে বিশেষ পদ্ধতিতে পানি সেচ দিয়ে কৃষকরা ফসল ফলাচ্ছেন।



