জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতিতে বৈষম্যের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশ অমান্যের প্রশ্ন

আপিল বিভাগের রায়ের পরও অধিকার ফেরেনি ৯৮৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর

এক যুগের বেশি সময় চাকরির বাইরে থাকার পর আপিল বিভাগের রায়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনর্বহাল হয়েছেন ৯৮৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী।

মো: আজিজুল হক, গাজীপুর মহানগর

Location :

Gazipur
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় |নয়া দিগন্ত

এক যুগের বেশি সময় চাকরির বাইরে থাকার পর আপিল বিভাগের রায়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনর্বহাল হয়েছেন ৯৮৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী। তবে চাকরিতে ফিরলেও তাদের অনেকের পদোন্নতি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এখনো নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষ করে আপিল বিভাগের রায়ে চাকরিচ্যুতির সময় থেকে পুনর্বহাল পর্যন্ত সময়কে ‘অসাধারণ ছুটি’ হিসেবে গণ্য এবং ওই সময়ের জ্যেষ্ঠতা অক্ষুণ্ন রাখার কথা বলা হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের।

বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, একদিকে ৯৮৮ জনের পদোন্নতির ক্ষেত্রে ‘শূন্য পদ নেই’ যুক্তি দেখানো হচ্ছে, অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আদালদতের নির্দেশনা উপেক্ষার অভিযোগও উঠেছে।

২৭ মে ২০২৫ প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগের বেঞ্চ ৯৮৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুনর্বহালের বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের করা আপিল মঞ্জুর করেন।

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০০৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে এমএলএসএস থেকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার সমমর্যাদার বিভিন্ন পদে নিয়োগপ্রাপ্তরা ছিলেন।

পরে উচ্চ আদালতের রায়ের পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১২ সালে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়। এ চাকরিচ্যুতির বিষয়ে ২০১৬ সালের ১৯ মে আপিল বিভাগ একটি রায় দিয়েছিলেন। পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ওই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করলে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর আপিলের অনুমতি দেয়া হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২৭ মে আপিল বিভাগ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আপিল মঞ্জুর করে।

আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে বলা হয়, চাকরিচ্যুত ৯৮৮ জনের মধ্যে জীবিত ব্যক্তিরা চাকরিতে পুনর্বহাল হবেন এবং চাকরিচ্যুতি থেকে পুনর্বহাল পর্যন্ত সময় ‘অসাধারণ ছুটি’ হিসেবে গণ্য হবে। ওই সময় তাদের জ্যেষ্ঠতাও ক্ষুণ্ন হবে না। পাশাপাশি চাকরিচ্যুতদের ভোগান্তি ও মানবিক দিক বিবেচনায় তাদের সুযোগ-সুবিধার বিষয় নির্ধারণের ক্ষমতা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়া হয়। অর্থাৎ আপিল বিভাগের ২০১৬ সালের রায় এবং যে রায়ের কারণে তাঁদের চাকরি গিয়েছিল, উভয়ই বাতিল করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু পুনর্বহালের পরও পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭০তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুনর্বহাল হওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগ্যতা ও প্রাপ্যতা অনুযায়ী দুই ধাপে পদোন্নতির বিষয়টি নির্ধারিত ছিল। প্রথম ধাপে একটি পদোন্নতি দেয়ার পর দ্বিতীয় ধাপে ৯৮৮ জনের মধ্যে মাত্র ২১৯ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ফলে ৭৬৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত রয়েছেন বলে তাদের দাবি।

তাদের প্রশ্ন, আপিল বিভাগের রায়ে যখন চাকরিচ্যুতি থেকে পুনর্বহাল পর্যন্ত সময়ের জ্যেষ্ঠতা অক্ষুণ্ন রাখার কথা বলা হয়েছে, তখন সেই জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান কী হবে? একদিকে ‘শূন্য পদ’ না থাকার কথা বলা হলেও অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির উদ্যোগ নেয়ায় বৈষম্যের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে বলে তারা দাবি করছেন।

এ নিয়ে সহকারী পরিচালক মো: আমির হোসাইন, সহকারী পরিচালক মনিরুজ্জামান ও সেকশন অফিসার মো: হাফিজুর রহমানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা হাইকোর্টে রিট করেন। রিট নম্বর ৫২২১/২০২৬। রিটকারীদের দাবি, শুনানি শেষে আদালত পদোন্নতি কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি এবং উপাচার্যকে দুই সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন।

রিটকারীদের অভিযোগ, আদালতের ওই নির্দেশের পরও ১১২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ‘বিতর্কিত পদোন্নতির’ কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার প্রশ্নও তুলেছেন তারা।

এদিকে বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কয়েকজনের বদলি ও শোকজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রথম রিটকারী মো: আমির হোসাইনকে চট্টগ্রামে বদলি করা হলে তিনি এর বিরুদ্ধে পৃথক রিট করেন। পরে আদালত ওই বদলির আদেশ স্থগিত করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। দ্বিতীয় রিটকারী মনিরুজ্জামানকেও বদলির আদেশ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া উপপরিচালক মাসুদুর রহমান, উপপরিচালক আকরাম হোসেন, উপপরিচালক বশির উদ্দিন ও উপপরিচালক মো: দিদারুল আলমকে আঞ্চলিক কেন্দ্রে বদলি করার অভিযোগও করেছেন বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের দাবি, প্রশাসনের কিছু সিদ্ধান্তের সাথে ভিন্নমত পোষণ করার পর এসব বদলি করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে ভিসির ঘনিষ্ঠ ও ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তার প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বঞ্চিতরা। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা কিছু কর্মকর্তা বর্তমান প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভূমিকা রাখছেন। এ কারণে ২০১২ সালে চাকরিচ্যুত হয়ে দীর্ঘ সময় কর্মস্থলের বাইরে থাকা ৯৮৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ।

তিনি বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীই চাকরিতে পূর্ণ পুনর্বহাল এবং পর্যায়ক্রমে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে কোনো পদোন্নতি দেয়া হয়নি।’

তার দাবি, পদোন্নতি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং পুরো প্রক্রিয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান ও আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে।

বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য, তারা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না; আপিল বিভাগের রায়ে স্বীকৃত জ্যেষ্ঠতা ও চাকরির অধিকার অনুযায়ী তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই তাদের দাবি। তাদের মতে, এক যুগের বেশি সময় চাকরির বাইরে থাকার পর আদালতের মাধ্যমে চাকরি ফিরে পাওয়ার পরও যদি পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতার প্রশ্নে নতুন করে বৈষম্যের মুখে পড়তে হয়, তাহলে পুনর্বহালের আইনি সুরক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

তাদের দাবি, ৯৮৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর পুনর্বহাল-পরবর্তী জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার বিষয়টি আপিল বিভাগের রায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের আলোকে স্বচ্ছভাবে নিষ্পত্তি করা হোক। একই সাথে আদালতের নিষেধাজ্ঞার পর পদোন্নতি কার্যক্রম চালানো হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে তা আদালতের আদেশের সাথে সাংঘর্ষিক কি না—তা নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।