সাদা পাহাড়ের সৌন্দর্য

নেত্রকোনায় পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়

সাদামাটির পাহাড়ে লেকের সবুজ ও নীল পানির চোখ ধাঁধাঁনো সৌন্দর্যে আনন্দে মেতে উঠছে পর্যটকরা। লেকের পানিতে নেমে কেউ কেউ মনের আনন্দে গোসলও করছেন।

ফজলুল হক রোমান, নেত্রকোনা
নেত্রকোনার দৃষ্টিনন্দন সাদা পাহাড় ও লেক
নেত্রকোনার দৃষ্টিনন্দন সাদা পাহাড় ও লেক

এক অনন্য অপরূপ, মন মুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের রানী দেশের একমাত্র সাদামাটির পাহাড় দেখতে ঈদের ছুটিতে নেত্রকোনার বিজয়পুরে এখন পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। ইতোপূর্বে এত লোকের সমাগম আর কেউ দেখেনি। সাদা মাটির পাহাড় শিশুসহ নারী-পুরুষের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠেছে।

সাদামাটির পাহাড়ে লেকের সবুজ ও নীল পানির চোখ ধাঁধাঁনো সৌন্দর্যে আনন্দে মেতে উঠছে পর্যটকরা। লেকের পানিতে নেমে কেউ কেউ মনের আনন্দে গোসলও করছেন। সাদা পাথরের এই দৃষ্টিনন্দন জায়গাটি নেত্রকোনা জেলার সীমান্ত এলাকায় গারো পাহাড়ের কোল ঘেঁষা কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বিজয়পুরে অবস্থিত।

নেত্রকোনা জেলার সীমান্ত এলাকায় দু’টি পর্যটন কেন্দ্রের একটি দুর্গাপুর ও অপরটি পাশের কলমাকান্দা। বাংলাদেশের একমাত্র বৃহত্তম প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ চীনা বা সাদামাটির পাহাড় এটি। এই এলাকা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠায় দিন দিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য ভ্রমণ পিপাসুরা ছুটে আসেন। সাদামাটির পাহাড়সহ এলাকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে সবুজে ঘেরা গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে উঠে। শুধু সাদা পাহাড় নয় এর আশপাশে দেখার মতো আরো অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সুসং রাজাদের রাজবাড়ি, কিংবদন্তি হাজং মাতার স্মৃতিসৌধ, গারো, হাজংপল্লী, টিলার উপরে রয়েছে রানী খং গির্জা, কমলা রীর দীঘি, দেখার মতো টিলার উপরে বিজিবি ক্যাম্প, এর পাশ থেকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের চোখ ধাঁধাঁনো অপরূপ সৌন্দর্য। আরো দখো যাবে গারো পাহাড় থেকে নেমে আসা সোমেশ্বরী নদীর স্বচ্ছ পানির ঢেউ। এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে যে কারো মনে হতে পারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে দাঁড়িয়েই সৌন্দর্য উপভোগ করছেন।

এছাড়া বিজিবি ক্যাম্পের ঢালে গিয়ে ভাড়ায়চালিত নৌকা নিয়ে পাহাড়ি নদী সোমেশ্বরীতে ইচ্ছে মত ঘুরে বেড়াতে পারবেন। পাহাড়ের ওপর কমলা বাগানটিও পর্যটকদের নজর কাড়বে। বিরিশিরি উপজাতি কালচার একাডেমিও হতে পারে ভ্রমণের এক নতুন অভিজ্ঞতা।

সীমান্তের এই সাদামাটির পাহাড়ে যাবার জন্য ঢাকা থেকে কমলাপুর কিংবা বিমানবন্দর রেলস্টেশন কিংবা মহাখালি বাসটার্মিনাল থেকেও ময়মনসিংহ হয়ে যাওয়া যায়। আর প্রাইভেট গাড়ি হলে তো কথাই নেই। তবে ভারি যান না নেয়াই ভালো। সাদামাটির পাহাড় এলাকায় কিছু খাবারের হোটেল গড়ে উঠলেও মান তেমন ভালো না। ঘুরাঘুরির ফাঁকে দুপুরে খাওয়ার জন্য নিজেদের চাহিদা মতো কিছু খাবার সাথে নিলেই ভালো হবে। ফিরতি পথে দুর্গাপুর শহরে খাবারের জন্য ভালো মানের কয়েকটি হোটেল রয়েছে। এছাড়াও রাত্রি যাপনের জন্য কয়েকটি হোটেল ও গেস্ট হাউজ রয়েছে।

এবার সাদা মাটির এই পাহাড়ের অজানা কিছু তথ্য সম্পর্কে জানা যায়, ১৯৫৭ সালের খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর তথানুযায়ী ১৫ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০০ মিটার প্রস্তর এই খনিজ অঞ্চলের সাদা মাটির পরিমাণ ধরা হয় ২৪ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন। যা দেশের ৩০০ বছরের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এখানে ১৬৩ টি সাদামাটির টিলা রয়েছে। ১৩ টি কূপ খননের মাধ্যমে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন মাটি উত্তেলান করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এগুলো প্রাকৃতিকভাবেই কেউলিন বা এলামিন সমৃদ্ধ। কোহিনূর অ্যালমুনিয়াম ও সিসিআই এই দু’টি কোম্পানি সর্বপ্রথম সরকারের ছাড়পত্রের মাধ্যমে ১৯৬২ সাল থেকে মাটি উত্তেলন শুরু করে।

পরে আরো আটটি কোম্পানি মাটি উত্তেলনের ছাড়পত্র লাভ করে। এই খনিজসম্পদ রক্ষার্থে ২০১০ সালে পাশ হওয়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে এবং সম্প্রতি হাইকোর্টের আদেশে মাটি উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। দেশের বৃহত্তম সাদা মাটির এই পাহাড়টি প্রাকৃতিক খনিজসম্পদের অন্তর্গত। মূল্যবান এই চীনামাটি বা সাদামাটি দিয়েই কাপ, প্লেট, টাইলসসহ নানান ধরনের সিরামিক সামগ্রী তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই খনিজ সম্পদ এক শ্রেণীর লুটেরা বছরের পর পর ইচ্ছা মতো যত্রতত্র মাটি উত্তোলন করায় সেখানে গভীর খাদের সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি এর সৌন্দর্যও হারাচ্ছে দিন দিন। এটি রক্ষার জন্য বিভিন্ন সময় নানান আন্দোলন ও মামলায় উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে সাম্প্রতিককাল থেকে মাটি উত্তেলন বন্ধ হয়েছে। অবহেলার কারণে সাদা মাটির পাহাড় এখন অনকটাই মলিন হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয় ওই স্থানটি ঝুকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই লেকের পানিতে নেমে গোসল করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে অনেকে প্রাণ হারান। তাই সেখানে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।

ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা একটি প্রাইভেট কোম্পানির ম্যানেজার সুলতান হায়দার জানান, ‘চমৎকার এই সাদামাটির পাহাড় ও আশাপাশের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। তবে ব্যবস্থাপনা উন্নত করা প্রয়োজন।’

দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সেক্রোটারি জামাল তালুকদার বলেন, ‘আমরা স্থানীয়রা সাদামাটির পাহড়সহ বিভিন্ন স্পটগুলোতে সরকার ও প্রশাসনের আরো উদ্যোগী হওয়া উচিৎ।’

দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মো: নাভিদ রেজুয়ানুল কবির নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিনিয়ত মনিটরিং করা হচ্ছে।’