খুলনায় ভূমিদস্যুদের পুনরাবির্ভাব, ৩২ পরিবার উচ্ছেদ আতঙ্কে

‘৩২ জনের পক্ষে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা সেটি আদালতে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে নির্দেশ পেলে তদন্তে পাঠাব।’

এরশাদ আলী, খুলনা ব্যুরো
মাথাভাঙ্গার বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ আতঙ্কে বাসিন্দারা
মাথাভাঙ্গার বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ আতঙ্কে বাসিন্দারা |নয়া দিগন্ত

খুলনা রূপসা সেতু চালু হওয়ার পর সেতুর বাইপাস সড়কের আশপাশে অনেক জমি-দখলবাজ তৎপর ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এসব ভূমিদস্যু গা ঢাকা দিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে আবার তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

এরকম এক ভূমিদস্যু লবণচরা থানাধীন মাথাভাঙ্গায় ১৯৭৩ সাল থেকে জমি কিনে বাড়ি করে বসবাসকারী ৩২টি পরিবার উচ্ছেদ করে প্রায় তিন একর জমি দখল করার চেষ্টা করছে। এ নিয়ে সেখানকার বাসিন্দাদের সাথে দখলবাজদের খুনোখুনি বেঁধে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে ওই এলাকার বাসিন্দারা থানায় জিডি করেছেন।

রূপসা সেতুর বাইপাস সড়কের পাশে বটিয়াঘাটা উপজেলার মাথাভাঙ্গা মৌজা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এক সময়ের এ জলাভূমি এখন কোটি টাকার সম্পদ। মৌজায় ১৬৫ নম্বর খতিয়ানের ২.৯৮ একর পরিমাণ একখানি জমিতে দু’ থেকে পাঁচ কাঠা করে জমি কিনেছেন ৩২ জন। জমির খাজনা ট্যাক্স দিচ্ছেন। হঠাৎ সেখানে এক ভূমিদস্যুর আবির্ভাব হয়েছে। তার দাবি সেখানকার সব জমি তিনি কিনে নিয়েছেন। বাসিন্দাদের চলে যেতে হবে। এটা শুনে বাসিন্দারা দিশেহারা। এ ব্যাপারে তারা লবণচরা থানায় জিডি করেছেন।

মাথাভাঙ্গা মৌজার এসএ ১৬৫ খতিয়ানের ৩২ জন প্লট মালিকদের পক্ষে আবদুল মান্নানের ৩১/১২/২৫ তারিখে করা জিডি নম্বর- ১৪১৪ অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে একটি পক্ষ হাইকোর্ট থেকে একতরফা ডিক্রি নিয়েছিল জমির মালিকানার ব্যাপারে। সেটার ওপর হাইকোর্টের সিভিল রিভিশন বিভাগ ০২/০৬/২৪ তারিখে স্থগিতাদেশ এবং জমিজমার দখল বিষয় স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেন। এ অবস্থায় ২৯/১২/২৫ তারিখে ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজের মো: আল মামুন ও তার সহযোগী ৫৫/৬০ জন অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি ওই জমিতে গিয়ে তাদের জীবননাশের হুমকি দেন। যেকোনো সময় ওই চক্র তাদের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি সাধন করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

গত মঙ্গলবার সকালে ওই এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শনকালে জমির মালিকরা জানান, আমাদের অধিকাংশ নিম্ন আয়ের মানুষ।

নগরীর মিনারা মসজিদের মোয়াজ্জিন আজিজুর রহমান বলেন, ডুমুরিয়া উপজেলার খলসী গ্রামের পৈত্রিক ২৯ শতক জমি বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে ২০১৭ সালে এখানে তিন কাঠা জমি কিনেছি।

তার জমিতে ভূমিদস্যু আল মামুন সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে দিয়ে জমি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করছেন। বলতে বলতে তিনি কেঁদে ফেলেন।

১৯৭৩ সালে বেলায়েত হোসেন জমি কিনে ১০ কাঠা জমি কিনে বাড়ি করেন। তিনি মারা গেছেন। তার মেয়ে শাহানারা (৫৫) বাসাবাড়িতে কাজ করেন। জমি কিনেছিলেন লাইলী বেগম। তিনি বলেন, আমি এখন বিধবা। বৃদ্ধা জাবেরুন নেছা (৭০) রাজমিস্ত্রির জোগালে (সহকারী) এবং ছেলে ইবাদুল নগরীর নতুন বাজারে লেবারের (শ্রমিক) কাজ করে মোট তিন কাঠা জমি কিনেছিলেন ১৭ বছর আগে। আব্দুল আজিজ গাজী রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তার বাড়ি সোয়া তিন কাঠার ওপর। তার ঘরটি ভেঙ্গে ফেলার হুমকি দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সেখানে বসবাসকারী ৩২টি পরিবার এখন উচ্ছেদ আতঙ্কে রয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা মহানগরীর গল্লামারী এলাকার বাসিন্দা আল মামুন যুবলীগের সদস্য হিসেবে আওয়ামী আমলের কুখ্যাত ভূমিদস্যু হাফিজের সহযোগী ছিল। সরকার পরিবর্তনের পর হাফিজের অনুপস্থিতিতে মামুন এখন রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে নিজেকে যুবদলের নেতা পরিচয় দিয়ে জিরো পয়েন্ট এলাকায় অফিস খুলে বসেছেন। তিনি ‘ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজ’ নামের সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে সেখানে সার্বক্ষণিক সন্ত্রাসী চেহারার আট/দশজন দিয়ে পাহারা দিচ্ছে। মালিকদের হুমকি-ধামকি প্রদানসহ কারো কারো ঘর ভেঙ্গে দিয়েছে। খুলনা মহানগরীর মুন্সীপাড়ায় বাড়ি, যুবদলের এক নেতা এ চক্রের সাথে রয়েছেন বলে সেখানকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেন।

এদিকে, জমি জোর-দখলের চেষ্টার বিষয়টি অস্বীকার করে ‘ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজর’ প্রোপ্রাইটার মো: আল মামুন বলেন, ‘ওই এলাকায় জমি কেনা মানুষগুলো প্রতারণার শিকার হয়েছে। জমির প্রকৃত মালিক আমি। তাদের যদি আসল দলিল থেকে থাকে তবে ক্ষতিপূরণ দিয়ে জমি ছেড়ে দেবো।’

জানতে চাইলে লবণচরা থানার ওসি মো: তুহিনুজ্জামান বলেন, ‘৩২ জনের পক্ষে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা সেটি আদালতে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে নির্দেশ পেলে তদন্তে পাঠাব।’