সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়ার আশায় প্রতিদিন শত শত রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই—এই অজুহাতে অনেককেই হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়। অথচ একই হাসপাতালের স্টোর রুমে বছরের পর বছর সরকারি ওষুধ পড়ে থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। এমন ঘটনাই ধরা পড়েছে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
হাসপাতালের সার্বিক সেবাব্যবস্থা নিয়ে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে স্টোর রুম পরিদর্শন করে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের সরকারি ওষুধ দীর্ঘদিন ধরে মজুদ রয়েছে। এসব ওষুধের মেয়াদ যাচাই করে দেখা যায়, কয়েকটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।
স্টোরে পাওয়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের মধ্যে রয়েছে পভিডোন, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে। ডাব্লিউএফএল ৫ এমএল-এর মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এবং জেড লিডোকেন ইনজেকশনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২৬ মার্চ ২০২৬। এছাড়া আরো কয়েক ধরনের সরকারি ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় স্টোরে সংরক্ষিত ছিল, যা পরে সরিয়ে নেয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রোগীদের মধ্যে যথাসময়ে এসব সরকারি ওষুধ বিতরণ না করে দীর্ঘদিন স্টোরে ফেলে রাখা হয়। ফলে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সেগুলো আর ব্যবহারের উপযোগী থাকে না।
তাদের দাবি, গত জুন মাসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে কিছু মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ অন্যত্র সরিয়ে নেয়। সময়মতো রোগীদের মধ্যে এসব ওষুধ বিতরণ করা হলে একদিকে যেমন অসহায় মানুষ উপকৃত হতেন, অন্যদিকে সরকারি সম্পদের অপচয়ও রোধ করা সম্ভব হতো।
স্টোর পরিদর্শনের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টোরকিপার ইসমাইল হোসেন প্রথমে দাবি করেন, ‘স্টোরে কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নেই। তবে অনুসন্ধানের একপর্যায়ে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বাক্স শনাক্ত হলে তিনি দ্রুত সেগুলো স্টোর থেকে সরিয়ে অপারেশন থিয়েটার (ওটি) কক্ষসংলগ্ন ওয়াশরুমে নিয়ে রাখেন। পরে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ স্টোরে থাকার কথা নয়। আমার ভুল হয়েছে। এজন্য আমি ক্ষমা চাই।’ একই সাতে তিনি সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্যও অনুরোধ জানান।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মোছা: মজিরন বেগম, আয়েশা খাতুন, রহিমা, ঝরনা খাতুনসহ একাধিক রোগী ও তাদের স্বজন জানান, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে থাকা অনেক প্রয়োজনীয় ওষুধ হাসপাতালের ওষুধ বিতরণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে অতিরিক্ত দামে ওষুধ কিনতে হয়।
মোছা: মজিরন বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে ওষুধ পাওয়ার আশায় আসি। কিন্তু বেশির ভাগ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। পরে যদি দেখি সেই ওষুধই হাসপাতালের স্টোরে পড়ে থেকে মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাহলে আমাদের মতো মানুষের কষ্টের দায় কে নেবে?’
আরেক রোগীর স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের বলা হয় ওষুধ নেই। অথচ সেই ওষুধই স্টোরে পড়ে থেকে নষ্ট হয়। এটি শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, জনগণের করের টাকায় কেনা সরকারি সম্পদের অপচয়।
মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ স্টোরে সংরক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: আ ফ ম ওবাইদুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ থাকতেই পারে, এটা দোষের কিছু নয়। তবে কেনো এসব ওষুধ দীর্ঘদিন স্টোরে রাখা হয়েছিল এবং সরকারি বিধি অনুযায়ী সময়মতো অপসারণ বা ধ্বংস করা হয়নি।
এ বিষয়ে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি ওষুধ যথাসময়ে রোগীদের মধ্যে বিতরণ করা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিধিমালা অনুযায়ী অপসারণ বা ধ্বংস করা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আইনগত ও প্রশাসনিক দায়িত্ব।
এক্ষেত্রে গাফিলতি শুধু সরকারি সম্পদের অপচয়ই নয়, বরং দরিদ্র রোগীদের ন্যায্য স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত করে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি ওষুধ সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম, অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা: মো: নুরুল আমীনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।



