মৌলভীবাজারে সাম্প্রতিক বন্যায় প্রায় শতকোটি টাকার ক্ষতি

মৌলভীবাজারে অতি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার মনু ও ধলাই নদীর ১৪টি স্থানের ভাঙন দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয় জেলার পাঁচটি উপজেলা।

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

Location :

Maulvibazar
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ ফসলের জমি
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ ফসলের জমি |নয়া দিগন্ত

মৌলভীবাজারের বন্যাকবলিত এলাকা থেকে পানি নেমে গেছে। ভেসে উঠছে ক্ষত চিহ্ন। বিধ্বস্থ হয়েছে গ্রামিন রাস্তাঘাট। উঠে গেছে সড়কের কার্পেটিং। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। কৃষি জমি তলিয়ে গিয়ে আউশ ফসল, আমনের হালিচারা ও শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

সরকারি তথ্যসুত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারে অতি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার মনু ও ধলাই নদীর ১৪টি স্থানের ভাঙন দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয় জেলার পাঁচটি উপজেলা।

সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষতির পরিমান প্রায় শত কোটি টাকা। সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের মনু ও ধলাই নদীর ১৪টি স্থান ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বাঁধ ভেঙে ও পানি উপচে প্লাবিত হয় মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর, কুলাউড়া, জুড়ী ও কমলগঞ্জসহ পাঁচটি উপজেলা। এতে ৯০ কিলোমিটার গ্রামিণ সড়ক, পাঁচটি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

বন্যায় পাঁচটি উপজেলার চার হাজার বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। নিঃস্ব হয়েছেন অনেকে। ভেসে গেছে ৪০৫টি পুকুরের মাছ। আর এতে ক্ষতি হয়েছে এক কোটি ১৬ লাখ টাকার।

এলজিইডির ১৩৮ কিলোমিটার সড়ক আর সাতটি ব্রিজের ৩৮ মিটার বিধ্বস্ত হয়ে ক্ষতি হয়েছে ৬১ কোটি টাকার বেশি। বছর বছর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল। হারাতে হয় কষ্টের ফসল। তাই টেকসই বাঁধ নির্মাণ আর ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

রাজনগর উপজেলার মনু নদীর উজিরপুর ভাঙ্গন স্থানের বাসিন্দা হারুন মিয়া বলেন, ‘বন্যায় আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে। বন্যা আসলেই আমাদের নিকট প্রশাসন ও অন্যান্যরা শুধু শুকনা খাবার নিয়ে আসেন। এই ট্রেডিশন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বছর ঘুরে বন্যার তান্ডব ঘটে। টেকসই বাধ নির্মাণ দিয়ে ভোক্তভোগিদের প্রয়োজনের আলোকে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। আর তা না হলে এই সব নিষ্ফল হয়ে যাবে।’

উজিরপুর গ্রামের রাসিক মিয়া বলেন, ‘আউশ নষ্ট হয়েছে, আমনের চারা পলিমাটির নিচে চাপা পড়েছে। এখন আগামীতে ঠিকে থাকার জন্য আমাদের হালি চারার প্রয়োজন। বন্যার ত্রাণ নিয়ে কি করবো। হালি চারার ব্যবস্থা হলে আমাদের অনেক উপকার হবে।’

একই এলাকার আবুল কালাম বলেন, ‘চার বিঘা আউশ নষ্ট হয়েছে এতে দুঃখ নেই এখন তিন বিঘা আমনের চারা নষ্ট হওয়াতে আমি দিশেহারা হয়ে গেছি।’

হরিপাশা গ্রামের উস্তার মিয়া বলেন, ‘মনুনদীর পরিত্যাক্ত প্রায় ১০০ একর জলাশয়ে আমাদের ৪০ জনের যৌথ মাছের ফিশারি ডুবে গিয়ে ৫০ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে।’

কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নের জাবদা গ্রামের মিছবাউর রহমান বলেন, ‘চার বিঘা গ্রীষ্মকালি শাকসবজি ডুবে গিয়ে নষ্ট হয়েছে।’

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক, নিলুফার ইয়াসমিন মোনালিসা সুইটি বলেন, ‘৮৫ দশমিক সাত হেক্টর জমির আউশ ধান আর ৫৫ দশমিক এক হেক্টর আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে ৫৫ দশমিক চার হেক্টর জমির বিভিন্ন ধরনের সবজি। এসব মিলিয়ে কৃষি বিভাগের ক্ষতি হয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি আট লাখ টাকার। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্থদের কৃষি প্রণোদনার আওতায় আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ।’

জেলা মৎস বিভাগ সুত্রে জানা গেছে, ৪০৫টি পুকুরের মাছ ও পোনা ভেসে গেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ টাকা।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: খালেদ বিন অলীদ বলেন, ‘নদীর বাঁধ ভাঙনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতি হয়েছে এক কোটি টাকা। ধলাই নদীতে সমীক্ষা করে টেকসই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে পাউবো।’

আর ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় মনু নদের কিছু কিছু স্থানে ব্লক বসানোর কাজ বাধাগ্রস্থ হলেও শিগগিরই সমাধানের আশা এই কর্মকর্তার।

তিনি আরো বলেন, ‘বন্যা ও মনু নদীর ভাঙন রোধে ২০২১ সালে ৯৯৬ কোটি ২৮ লাখ টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। তবে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে বিএসএফের বাধায় কুলাউড়ার শরীফপুর ইউনিয়নের দত্তগ্রাম, নিশ্চিন্তপুর, তেলিবিল ও বাগজুর এলাকায় বন্ধ রয়েছে বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ।’

এ ব্যাপারে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিতে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এখন দুই দেশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে জোরালো আলোচনায় কেবল সমাধান আসতে পারে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।