রংপুরের ডিসিকে আঙ্গুল উচিয়ে শাসালেন বিএনপির পরাজিত প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা

রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টার দিকে আঙ্গুল উচিয়ে রংপুর রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ এনামুল আহসানকে শাসালেন ৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনের বিএনপির পরাজিত প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা।

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো

Location :

Rangpur
রংপুরের ডিসিকে আঙ্গুল উচিয়ে শাসালেন বিএনপির পরাজিত প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা
রংপুরের ডিসিকে আঙ্গুল উচিয়ে শাসালেন বিএনপির পরাজিত প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা |নয়া দিগন্ত

‘আপনি আমার ফল ছিনতাই করেছেন, এর জবাব আল্লাহর তরফ থেকে পাবেন। আমার বাউ বাচ্চাকে আপনি কষ্ট দিয়েছেন, তারা চোখের পানি ফেলেছে। আল্লাহর তরফ থেকে আপনার বিচার হবে, আপনার বউ বাচ্চারও রাস্তায় নামবে।’ বলে আঙ্গুল উচিয়ে রংপুর রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ এনামুল আহসানকে শাসালেন ৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনের বিএনপির পরাজিত প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা।

রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টার দিকে ডিসি অফিসের কার্যালয়ে ডিসিকে উদ্দেশ্য করে হাত উচিয়ে এই মন্তব্য করেন তিনি।

ভোট পুনগণনার দাবিতে বেলা সাড়ে ১২টা থেকে রংপুর, ৩, ৪ ও ৬ আসনের বিএনপির পরাজিত প্রার্থীরা নেতাকর্মীদের নিয়ে ডিসি অফিস ঘেরাও করেন। পরে পরাজিত প্রার্থী সাইফুল ইসলাম, সামসুজ্জামান সামু ও এমদাদুল হক ভরসা ডিসির রুমে গিয়ে পুনগণনার দাবিতে স্মারকলিপি দেন।

এসময় ডিসি ভোট পুন: গণনার অনুমতি আইন অনুযায়ী তার হাতে নেই, ইলেকশন ট্রাইবুনালে মামলার কথা বললে এমদাদুল ভরসা ডিসিকে উদ্দেশ্য করে দুই আঙ্গুল উচিয়ে উচিয়ে কথা বলেন এবং বিভিন্ন অভিযোগ আনেন।

এসময় এমদাদুল হক ভরসা ডিসিকে আরো বলেন, ‘আমরা জানতে চাচ্ছি। আমরাতো অভিযোগ দিয়েছি। ভোট পুনগণনা করতে কত দিন লাগবে। ৫ বছর পরে ২ বছর নাকি কালকে। আপনি আমাদের টাইম ফ্রেম বলেন। আপনি যদি এখন আমাকে সিস্টেম দেখান। যখন ভোটটার অনিয়ম করেছেন তখন তো সিস্টেমে করেন নাই। তখন তো অনিয়মে করছেন। এখন যদি আমাকে সিস্টেমে ফেলান। আমি এটা মানবো না। আমার কথা হলো। আমার গণনা আমি দ্রুত যাই কবে। কবে নিষ্পত্তি হবে।

পরাজিত প্রার্থী এমদাদুল ভরসা আরো বলেন, ‘ভাই আমার কথাটা হলো। আপনি যখন অনিময় করলেন তখন তো কোনো সিস্টেম ছিল না। আমার কপালে আপনি সিস্টেম আনতেছেন। আমি এটা মানতে রাজি নই। আপনি আমাকে বলেন, কয়দিন লাগবে। আমি দুইভাবে রাস্তায় হাটবো ভাই। আমি আন্দোলন করবো। আমি আইনি মাধ্যমেও হাত দেবো। আপনার হাতে সব আছে। আপনার হাতে ব্যালট আছে। আপনি টাইম কিল করে ব্যালট চেঞ্জ করে দিবেন। সে ক্ষমতাও আপনার আছে। আমার জনগণকে বলেন কবে নাগাদ, কয়দিন লাগবে।’

দুই আঙ্গুল উচিয়ে এমদাদুল হক ভরসা ডিসিকে আরো বলেন, আপনি জানেন না। আমরা ১৭ বছর জীবন যুদ্ধ করেছি। আপনি এখন সিস্টেমের কথা বলেন, ভাই আমার অভিশাপ লাগবে। আমার বালবাচ্চারা কানতেছে। আল্লাহর তরফ থেকে আপনার বাল বাচ্চারা রাস্তায় নামবে। এটা আমার অভিশাপ। আপনি আমার ফলাফল ছিনতাই করেছেন। এর জবাব আল্লাহর পক্ষ থেকে পাবেন। আপনার ফ্যামিলি পাবে। আমার বউ বাচ্চাকে আপনি কষ্ট দিচ্ছেন। আমার বউ বাচ্চার যে চোখের পানি আপনি ফেলাইছেন। আল্লাহর তরফ থেকে আপনার বিচার হবে। আপনার বিচার হবে। আপনার বিচার হবে।’

পরে সেখানে উপস্থিত জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও ৬ আসনে পরাজিত প্রার্থী সাইফুল ইসলাম এবং মহানগর আহ্বায়ক ৩ আসনের পরাজিত প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু এমদাদুল ভরসাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেন। এসময় ডিসির কক্ষেই এমদাদুল ভরসার নেতাকর্মীদের ডিসির দুই গালে জুতা মারো তালে তালে বলে স্লোগান দিতে দেখা যায়। তারা গালিগালাজও করেন।

দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে পৌনে ৩টা পর্যন্ত ডিসি অফিস ঘেরাও করে সমাবেশ ও বিক্ষোভ করেন নেতাকর্মীরা।

পরে এক ব্রিফিংয়ে রিটার্নিংকর্মকর্তা মোহাম্মদ এনামুল আহসান বলেন, ‘রংপুর-৩, ৪ ও ৬ আসনের বিএনপির প্রার্থী ভোট পুনগণনার জন্য আবেদন দিয়েছে। সে আবেদনগুলো আমরা যথাযথভাবে গ্রহণ করেছি। আমরা দ্রুত নির্বাচন কমিশন সচিবলায়ে প্রেরণ করবো।

নির্বাচনী আইন ১৯৭২ সালের গণ প্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী ফলাফল ও গেজেট প্রকাশের পর নির্বাচনী ট্রাইবুনাল কিংবা উচ্চ আদালতের আদেশ ছাড়া ছাড়া ভোট পুনগণনার কোনো অনুমতি দেয়ার ক্ষমতা আমার নাই। তারপরেও আজ আমার সাথে কি ভাষায় বলা হয়েছে তা মব তৈরির চেষ্টা। এই জাতিয় মব কন্ট্রোলের জন্য আমাদের যে সিআরপিসি ধারা রয়েছে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। রংপুরে জেলা অত্যন্ত আনন্দমুখর উৎসবের আমেজে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ভোট হয়েছে। ৬৫ ভাগ ভোটার ভোট প্রদান করেছেন। এটাকে বিতর্কিত করার কোনো সুযোগ নেই।

এ ব্যাপারে রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) আসনের এমপি এনসিপি সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেছেন, ‘মব তৈরি করে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা রিটার্নিং কর্মকর্তার সাথে অসদাচরণ করে আইন লঙ্ঘন করেছেন। কিন্তু আইনশৃংখলা বাহিনী কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। বিএনপির হাই কমান্ড তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এটা খুবই ভয়াবহ ব্যাপার। এর মাধ্যমে প্রমাণ হচ্ছে যে ক্ষমতায় গেলে তারা প্রশাসনের সাথে কি ধরণের ব্যবহার করবে। তাদের অন্যায় কথা না শুনলে তারা প্রশাসনকে টিকতেই দিবে না।

বিএনপির চেয়ারম্যান সাংবাদিক সম্মেলনে ঐক্যের কথা বলছেন, কিন্তু তার মাঠের কর্মীরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে মব তৈরি করে হামলা করছে। আগুন দিচ্ছে। এই ধরণের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে বিএনপি এ দেশের মুক্তিকামী মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। আমরা এই মব তন্ত্রের বিরুদ্ধে রাজপথে নামবো। তবুও নিবার্চনকে কলুষিত করার কোনো ষড়যন্ত্র মেনে নেবো না।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও প্রচলিত বিধি অনুযায়ী নির্বাচনী ফলাফল পুনর্গণনার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, গেজেট প্রকাশের পর আরপিও অনুযায়ী রিটার্নিং অফিসারের মাধ্যমে ফলাফল পরিবর্তনের সুযোগ থাকে না। সেক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ প্রার্থীকে নির্বাচন পরবর্তী ৪৫ দিনের মধ্যে ‘ইলেকশন পিটিশন’ বা নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে হয়। ট্রাইব্যুনাল বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোট পুনর্গণনার নির্দেশ দিতে পারেন।

আরপিওতে আরো বলা হয়েছে, নির্বাচনের ফলাফল একত্রীকরণের সময় যদি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তার নির্বাচনী অ্যাজেন্ট ভোটের গণনা নিয়ে লিখিতভাবে আপত্তি জানান এবং পুনর্গণনার যৌক্তিক দাবি তোলেন, তবে রিটার্নিং অফিসার ওই কেন্দ্রের বা আসনের ভোট পুনর্গণনা করতে পারেন।

পুনর্গণনার শর্তে বলা হয়েছে, যদি কোনো প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের পার্থক্য খুবই সামান্য হয় এবং গণনায় ভুল থাকার সম্ভাবনা থাকে, তবে রিটার্নিং অফিসার নিজ বিবেচনায় অথবা প্রার্থীর আবেদনে পুনর্গণনার সিদ্ধান্ত নেন।

আরপিওতে আরো বলা হয়েছে, ফলাফল একত্রীকরণের পর থেকে সরকারি গেজেটে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ করার সুযোগ থাকে। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ইসি তদন্ত সাপেক্ষে কোনো কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত বা পুনরায় গণনার নির্দেশ দিতে পারে।

২০২৫ সালের সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, নির্বাচনের কোনো কেন্দ্রে বা সম্পূর্ণ আসনে গুরুতর অনিয়ম প্রমাণিত হলে নির্বাচন কমিশন সেই ফলাফল বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। তবে গেজেট হওয়ার পর রিটার্নিং কর্মকর্তার হাতে এ বিষয়ে কোনো ক্ষমতা নাই। আদালতের মাধ্যমেই আসতে হবে।