বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মুহম্মদ রেজাউর রহমান ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টায় কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের নগুয়া এতিমখানা রোডের বাসায় মৃত্যু হয় তার।
তার চাচাত ভাই জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ সুমন নয়া দিগন্তকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সুমন বলেন, কবি রেজাউর রহমান বেশ কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। এর মধ্যে ঢাকায় চিকিৎসা করে সুস্থ হন। গত দু’দিন ধরে তিনি জ্বরে আক্রান্ত। পরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন। ঈদের ছুটিতে হাসপাতালে ডাক্তার নার্স সঙ্কট থাকায় তিনি বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তার শারীরিক অবস্থা বেশি খারাপ হলে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার প্রস্তুতি নেয়া হয়। সেখান তাকে আর নেয়া যায়নি।
আজ মঙ্গলবার জোহরের নামাজের পর জেলা শহরের শহীদি মসজিদ প্রাঙ্গণে রেজাউর রহমানের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
রেজাউর রহমানের মৃত্যুর খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শোক প্রকাশ করেছে। তার পরিবারের প্রতি শোক জানিয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি মো: শরিফুল আলম, সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মো: রমজান আলী, কিশোরগঞ্জ সেন্ট্রাল প্রেস ক্লাবের সভাপতি আশরাফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মো: আল আমিন, কিশোরগঞ্জ সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি লেখক ও গবেষক মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নুরুল আউয়াল তারামিঞা প্রমুখ।
সত্তরের দশক থেকে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, রম্যরচনা ও শিশুসাহিত্যে রেজাউর রহমানের বিচরণ। যুক্ত হন সাংবাদিকতায়। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকায় দৈনিক সংগ্রামে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যুক্ত ছিলেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত শিশুতোষ পত্রিকা সবুজ পাতায় সত্তরের দশক থেকে তিনি সহজ ভাষায় কুরআন ও হাদিসের অনুবাদ লিখে গেছেন।
শেষবেলায় জেলা শহরে বসবাস করলেও রাজধানীকেন্দ্রিক সাহিত্যের সাথে তার ছিল আত্মিক সম্পর্ক। কিশোরগঞ্জ শহরে তাদের পৈত্রিক প্রাচীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শাহজাদী জর্দা ঘরের হাল ধরতে নব্বইয়ের দশকে তিনি ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ চলে আসেন।
সত্তরের দশকের শুরুতে তিনি গড়ে তুলেন ‘সুধাকর’ নামে একটি সাহিত্য সংগঠন। ১৯৭৩ সালে ওই সংগঠন থেকে ভাষা শহীদদের স্মরণে প্রথম ‘রক্তের স্বরলিপি’ নামে সংকলন সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন। এরপর তিনি সাপ্তাহিক বাংলার দর্পন, দৈনিক জাহান, সাহিত্য মাসিক চন্দ্রাকাশ, অঙ্গীকার ডাইজেস্ট, সাপ্তাহিক মাটির বাংলা ও ইসতিকলাল, সাহিত্য পত্রিকা উত্তরকাল সম্পাদনা করেন।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পাতায় এবং সংকলনে তার লেখা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ১৯৮৪ সালে প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলামকে নিয়ে কিশোরগঞ্জে তিনি গড়ে তুলেন কিশোরগঞ্জ সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ নামে একটি সংগঠন। সংগঠনটি কিশোরগঞ্জে প্রধান সাহিত্য সংগঠন হিসেবে এখনো পরিচিত। ২০০৩ থেকে ২০১০ পর্যন্ত টানা সাত বছর তিনি পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরিষদের প্রকাশিত সংকলনগুলোতেও তার অসংখ্য লেখা ছাপা হয়েছে। তিনি পরিষদ আয়োজিত সাহিত্যসভায় ও সাহিত্যসম্মেলনগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। এছাড়াও কিশোরগঞ্জে সাংবাদিকদের ক্লাবসহ নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন। কবিতা লিখতেন তিনি রেজা রহমান নামে।
মুহম্মদ রেজাউর রহমান ১৯৫৫ সালের ১১ জানুয়ারি করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক নাম ছিল বাবুল। তার বাবা আব্দুর রহমান ১৯৭১ সালের পরে কিশোরগঞ্জে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। মা আমেনা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। তাদের পরিবার ছিল সংস্কৃতিমনা। রেজাউল রহমান ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান। তার স্ত্রী মমতাজ বেগম, এক ছেলে জাইসী মোহাম্মদ নাভীদ (নরওয়ের অভিবাসী) ও এক মেয়ে সারওয়াত নুয়েরী। এছাড়া তার চার ভাই ও তিন বোন রয়েছে।



