গতকালও আমরা একসাথে হেফজখানায় গিয়েছিলাম। একটু ছুটি নিয়ে ঘরে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি আমার অনেক বান্ধবী আর নেই। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন।
কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিল ১১ বছর বয়সী রোহিঙ্গা কিশোরী ইসমত আরা। ভয়াবহ পাহাড়ধসে নিহত দুই সহপাঠী উম্মে নাজাত ও উম্মে সালমাকে হারানোর শোক এখনো তাকে তাড়া করে ফিরছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল ৯টায় নিহত শিশুদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে, বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে কক্সবাজারের উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এ/৩ ব্লকে মেয়েদের একটি হেফজ মাদরাসায় ভয়াবহ পাহাড়ধসের ওই ঘটনা ঘটে। মুহূর্তেই পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ে মাদরাসার ভবনের উপর। মাটিচাপা পড়ে প্রাণ হারায় একের পর এক কোমলমতি শিক্ষার্থী।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুর্ঘটনার পরও পুরো ক্যাম্পজুড়ে শোকের ছায়া। কোথাও স্বজন হারানোর আহাজারি, কোথাও নির্বাক বসে আছেন সন্তানহারা বাবা-মা। দাফন শেষে ছোট ছোট কবরের পাশে দাঁড়িয়ে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
নিহতদের মধ্যে উম্মে নাজাত (১০) ও উম্মে সালমা (১১) ছিল একই পরিবারের দুই বোন। তাদের বড় ভাই আরমান বলেন, ঘটনার পর থেকে আমার বাবা আব্দুস শুক্কুর কারো সাথে কথা বলছেন না। শুধু চুপচাপ বসে থাকেন। আর মা রুপ বাহার কিছুক্ষণ পর পর অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন।
কাঁদতে কাঁদতে শিশু দু’টির দাদা আব্দুর রহমান বলেন, নাতনিদের কোরআনের হাফেজা বানানোর স্বপ্ন ছিল। আল্লাহ নিষ্পাপ জান্নাতের পাখিদের নিজের কাছে নিয়ে গেলেন। এখন দোয়া করা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই।
অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যাওয়া জান্নাত আরা (১১), নুর বাহার (১০) ও মায়েশা বিবি এখনো আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তারা জানায়, আমরা ভেবেছিলাম আর বাঁচব না। আল্লাহ আমাদের নতুন জীবন দিয়েছেন।
মায়েশার মা হালিমা খাতুন বলেন, আমি মনে করেছিলাম মেয়েটাকে আর ফিরে পাব না। আল্লাহ তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। এজন্য হাজারো শুকরিয়া।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় আকস্মিকভাবে ধস নামে। মাদরাসায় তখন শিশু শিক্ষার্থীরা কোরআন তেলাওয়াত করছিল। কেউ বুঝে ওঠার আগেই মাটিচাপা পড়ে পুরো হাফেজখানাটি।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দা, স্বেচ্ছাসেবক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। মাটির স্তূপ সরিয়ে একে একে উদ্ধার করা হয় নিহত ও আহতদের।
বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। গত ৬-৮ জুলাইয়ের টানা ভারী বর্ষণে উখিয়া ও টেকনাফে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিধসের পর ৯ জুলাই পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উদ্ধার তৎপরতা তদারকি করেন এবং দুর্ঘটনাকবলিত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেন।
উখিয়া থানা পুলিশ জানিয়েছে, ধসে পড়া এলাকাগুলোতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা চুরির ঘটনা ঠেকাতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে এবং সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে অনুরোধ করেছে প্রশাসন।
আকস্মিক পাহাড়ধস শুধু কয়েকটি প্রাণই কেড়ে নেয়নি; ভেঙে দিয়েছে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন। যে ছোট ছোট হাতগুলো একদিন পবিত্র কোরআন মুখস্থ করে হাফেজ হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, সেগুলো আজ নিথর। ক্যাম্পের আকাশে এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে স্বজনদের কান্না।



