লালমনিরহাটের নদী, নালা ও জলাশয়ে পাট কাটা, জাগ দেয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া, শুকানো ও তা বাজারে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। বিভিন্ন হাট-বাজারে উঠতে শুরু করেছে নতুন পাট। তবে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার কারণে পাটগাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ায় চলতি মৌসুমে পাটচাষের উৎপাদন খরচ না তুলতে পারার আশঙ্কায় কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় চার হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে পাটের চাষাবাদ হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় ৭৩০ হেক্টর বেশি। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৯ হাজার ৫৪৯ মেট্রিক টন। অন্য বছরের তুলনায় এ মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূল না থাকায় পাটের দৈর্ঘ্য স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ ফুট পর্যন্ত কম হয়েছে। এর পাশাপাশি নদী ভাঙ্গন এবং অতি বৃষ্টিতেও পাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
জানা গেছে, জেলা সদর উপজেলাসহ আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রামের বিভিন্ন হাট-বাজারে স্বল্প পরিসরে নতুন পাট কেনাবেচা শুরু হয়েছে। বর্তমানে নদী, নালা ও জলাশয়ে পাট জাগ দেয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া, শুকানো ও তা বাজারে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যস্ততা বাড়ছে। চলতি মৌসুমে বীজ বপন ও চারা বৃদ্ধির সময় টানা বৃষ্টিপাতের কারণে বেশির ভাগ পাটগাছের উচ্চতা স্বাভাবিকের তুলনায় তিন থেকে পাঁচ ফুট পর্যন্ত কমে গেছে। সাধারণত একটি পাটগাছ সাত থেকে ১৩ ফুট পর্যন্ত লম্বা হলেও এবার তা হয়নি। ফলে গাছ ছোট হওয়ায় বিঘা প্রতি গড়ে ৪০ থেকে ৬০ কেজি (প্রায় এক থেকে দেড় মণ) পর্যন্ত পাটের আঁশ উৎপাদন কমে গেছে। এতে পাট চাষের উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে কৃষক।
সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, এক বিঘা জমিতে পাট চাষে বীজ, সার, নিড়ানি ও প্রসেসিং মিলিয়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়। গাছ ছোট হওয়ায় বিঘা প্রতি ফলন কমে প্রায় ছয় মণে নেমেছে। বর্তমান বাজার দরে প্রতি মণ চার হাজার টাকা হিসেবে পাওয়া যায় ২৪ হাজার টাকা। তিন মাসের কঠোর পরিশ্রমে সব খরচ বাদ দিলে বিঘা প্রতি লাভ থাকে মাত্র আট হাজার টাকার মতো। আর জমি লিজ নেয়া থাকলে কোনো লাভেই থাকে না।
একই উপজেলার মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নের কৃষক শফিকুল ইসলাম জানান, প্রতি মণ পাট উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় আড়াই টাকা। ফলন কমে বিঘা প্রতি ছয় থেকে সাত মণ হওয়ায় বাজারের ভালো দাম সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত লাভ হাতছাড়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘গাছ খাটো হওয়ায় প্রতি বিঘায় গড়ে ৪০ থেকে ৬০ কেজি পর্যন্ত আঁশ কম উৎপাদন হতে পারে।বাজারে পাটের দাম ভালো থাকলেও ফলন কম হওয়ায় লাভের কোনো আশা দেখছি না।’
জেলার পাট ব্যবসায়ী দুলাল মিয়া বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার পাটের শুরুতেই ভালো দাম মিলছে। গত বছর মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাট তিন হাজার ৪০০ থেকে তিন হাজার ৮০০ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে। এবার তা বেড়ে চার হাজার থেকে চার হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তবে আকারে ছোট পাটের দাম আরো কম হওয়ায় কিছু কিছু পাট চাষি উৎপাদন খরচ তুলতে বিপাকে পড়েছেন।’
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার সোহায়েল আহমেদ বলেন, ‘বীজ বপন ও চারা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে গাছের স্বাভাবিক উচ্চতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ফলনে। তবে এবার পাটের বাজার ভাল আছে। ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারবেন।’
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. মো: সাইখুল আরিফিন জানান, অতিবৃষ্টির কারণে কিছু নিচু এলাকায় উৎপাদন কিছুটা কম হলেও সামগ্রিকভাবে জেলার অনেক স্থানেই সন্তোষজনক ফলন হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো বাজারে পাটের দাম বেশ ভালো।
তিনি আরো জানান, কৃষকদের এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ও সহায়তার জন্য সরকার উন্নতমানের বীজ, আধুনিক কৃষি উপকরণ এবং বাজারে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে।



