খুলনায় লবণাক্ত জমিতে বার্লি চাষে অভাবনীয় সাফল্য

উদ্যোক্তা কৃষক মনিরুলের সাফল্যে ভর করে বার্লিকে উপকূলীয় কৃষির নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।

শেখ দীন মাহমুদ, পাইকগাছা (খুলনা)

Location :

Paikgachha
বার্লির ক্ষেত
বার্লির ক্ষেত |নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদ খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় লবণাক্ত জমিতে বার্লি চাষ করে সফলতা পেয়েছেন কৃষক মনিরুল ইসলাম। রবি মৌসুমে এক বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে এ ফসল চাষ করেন তিনি।

সাদা সোনা চিংড়িতে ভর করে এক সময় যখন ডুবতে বসেছিল পাইকগাছার কৃষি। এক সময় আবার অব্যাহত লোকসানের মুখে পর্যায়ক্রমে কৃষক উঁকি দেয় ফের মাঠে। তরমুজ বিপ্লবের পাশাপাশি সবজির আবাদ নজর কাড়ে সকলের। পর্যায়ক্রমে বোরো, সরিষা, গম ভূট্টার সাথে তরুণ উদ্যোক্তারা নজর কাড়ছেন ব্যাতিক্রমী আবাদে। সফলও হচ্ছেন তারা।

বার্লির নতুন উদ্যোক্তা কৃষক মনিরুল খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কাজীমুছা গ্রামের আয়ুব আলী বিশ্বাসের ছেলে। তার সাফল্যে ভর করে বার্লিকে উপকূলীয় কৃষির নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।

রামচন্দ্রনগর মৌজায় প্রায় এক বিঘা জমিতে প্রথম বারের মত আবাদ করেছেন, বারি-৭ ও বারি-১০ জাতের বার্লি। প্রথম বারেই অপরিচিত বার্লি চাষে রীতিমত চমক সৃষ্টি করেছেন তিনি। বার্লির গাছ দেখতে অনেকটা গমের মতো হলেও নতুন সফল আবাদের খবরে স্থানীয়দের পাশাপাশি প্রতিদিন দূর-দুরন্ত থেকে শত শত মানুষ আসছেন মনিরুলের বার্লির ক্ষেত দেখতে। অনেকে নতুন এ আবাদে মশগুলও হচ্ছেন। আগ্রহে পরামর্শ নিচ্ছেন অনেকেই। ধারণা করা হচ্ছে, আগামীতে তার মতো অনেকেই বার্লির আবাদ শুরু করবেন।

বার্লি মূলত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ একটি রবি শস্য। মাল্ট তৈরি ও পশু খাদ্য হিসেবে বার্লির চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে বার্লির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন চাহিদা অনুযায়ী অপর্যাপ্ত হওয়ায় ঘাটতি মেটাতে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, ইউক্রেন এবং কানাডা থেকে আমদানি করা হয়। বার্লি আমদানিতে সরকারকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। দেশের অন্যান্য স্থানে কমবেশি বার্লির চাষ হলেও উপকূলীয় অঞ্চলে এটি প্রথম ও অপরিচিত নতুন ফসল।

কৃষকদের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকরা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ খুলনার মাধ্যমে প্রথম বারেই উদ্যোক্তা মনিরুলের মাধ্যমে লবনাক্ত জমিতে বার্লি চাষ করে উপকূলীয় কৃষিতে সফলতার মুখ দেখেছেন। কৃষক হিসেবে মনিরুলও জায়গা করে নিয়েছেন।

কৃষক মনিরুল ইসলাম জানান, এর আগে এই জমিতে রবি ফসল হিসেবে গম এবং বোরোধানের চাষ করতেন তিনি। কৃষি গবেষণা বিভাগের গবেষকদের পরামর্শে প্রথম বারের মতো বার্লি চাষ করেছেন। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট তাকে বীজ, সার সরবরাহ করেছে। এরপরও প্রথম বারে ফলন বা সফলতা নিয়ে দুশ্চিন্তাও কম ছিল না তার। তবে ঈর্ষণীয় ফলনে ছোখে-মুখে তার অন্য রকম তৃপ্তি। তাকে দেখে অন্যদের আগ্রহে গর্ব অনুভব করছেন তিনি।

কৃষি গবেষণা বিভাগ খুলনার বৈজ্ঞানিক সহকারী মো: জাহিদ হাসান বলেন, ‘বারি বার্লি-৭ ও বারি বার্লি -১০ দু’টি জাতই লবণ সহিষ্ণু এবং উপকূলীয় অঞ্চলে চাষের জন্য উপযোগী।’

তিনি বলেন, ‘গম এবং বার্লির উৎপাদন প্রায় সমান হলেও গমের চেয়ে বার্লি উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। এছাড়া গমের চেয়ে বার্লি অনেক বেশি পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। এজন্য বার্লি একটি লাভজনক ফসল।’

তিনি আরো জানান, এর আগে খুলনার দক্ষিণের কয়রা উপজেলায় পরীক্ষামূলক চাষ হলেও পাইকগাছায় কৃষক মনিরুল ইসলামই প্রথম উদ্যোক্তা। এখন মিল্ক পর্যায়ে রয়েছে। বারি বার্লি-৭ এর চেয়ে বারি বার্লি-১০ তুলনামূলক একটু বেশি লম্বা ও উঁচু হয়েছে। আগামী ২০ দিন পর বার্লি উত্তোলন করা যাবে। বারি-৭ হেক্টরপ্রতি আড়াই টন এবং বারি-১০ হেক্টর প্রতি তিন টন উৎপাদন হতে পারে বলেও মনে করছেন তিনি।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ একরামুল হোসেন বলেন, ‘বার্লি চাষ পাইকগাছায় এটাই প্রথম। এটি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সম্পূর্ণ তদারকি করছে। তবে উপকূলীয় কৃষিতে বার্লি সংযোজন হলে সম্ভাবনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘এর আবাদ সম্প্রসারিত হলে পুষ্টি ও গো-খাদ্যের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতা হ্রাস ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।’

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সরেজমিন গবেষণা বিভাগ খুলনার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো: কামরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে বার্লির স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে পরীক্ষামূলক চাষে সফলতায় ভর করে রীতিমত সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’

মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারিত হলে বার্লির উৎপাদন এবং এর ব্যবহারও বাড়বে বলে আশা করেন তিনি।

উপকূলীয় কৃষিকে টেকসই ও সমৃদ্ধ করতে আগামীতে বার্লির চাষ সম্প্রসারণ জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।