হাটহাজারীতে ‘রাইস গার্ডেন’ স্থাপন, সাড়া ফেলেছে কৃষকদের মাঝে

‘এ ধরনের রাইস গার্ডেন আগে কখনো দেখা যায়নি। একসাথে এতগুলো জাত দেখে বাস্তব ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। যা ভবিষ্যতে উপযোগী জাত নির্বাচন করতে সহায়তা করবে।’

আবুল বাশার, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম)

Location :

Chattogram
রাইস গার্ডেন, একইসাথে বিভিন্ন জাতের ধানগাছের মেলা
রাইস গার্ডেন, একইসাথে বিভিন্ন জাতের ধানগাছের মেলা |নয়া দিগন্ত

চট্টগ্রামে প্রথমবার স্থাপিত হলো ‘রাইস গার্ডেন’। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে এলএসটিডি প্রকল্পের উদ্যোগে ও অর্থায়নে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার চারিয়া প্রযুক্তি গ্রামে এই ‘রাইস গার্ডেন’ স্থাপিত হয়।

কৃষকদের কাছে উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সহজভাবে পৌঁছে দেয়া, মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন জাত সম্পর্কে বাস্তব ধারণা তৈরি করা এবং কৃষকদের উন্নত ধান চাষে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে এলএসটিডি প্রকল্পের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো ওই ‘রাইস গার্ডেন’ স্থাপন করা হয়।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) স্যাটেলাইট স্টেশন, চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধানে বোরো মৌসুম উপযোগী ৫৬টি ধানের জাত নিয়ে এই প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ ধরনের উদ্যোগ এই প্রথম। যা কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

এলএসটিডি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলার প্রায় ১৫টি প্রযুক্তি গ্রামে একই ধরনের রাইস গার্ডেন স্থাপন করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষকদের কাছে উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া, মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন জাত সম্পর্কে বাস্তব ধারণা তৈরি করা এবং কৃষকদের উন্নত ধান চাষে উৎসাহিত করা।

রাইস গার্ডেনে বোরো মওসুমে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) কর্তৃক উদ্ভাবিত বিভিন্ন ধানের জাত প্রদর্শন করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে— উচ্চ ফলনশীল ব্রি ধান ১০৮ ও ব্রি ধান ১০২, স্বল্পমেয়াদি ব্রি ধান ৮৮, জিংক সমৃদ্ধ ব্রি ধান ১০০, ডায়াবেটিক উপযোগী ব্রি ধান ১০৫, ব্লাস্ট প্রতিরোধী ব্রি ধান ১১৪-সহ বিভিন্ন হাইব্রিড জাত।

মোট প্রায় ৫৬টি জাত একই মাঠে পাশাপাশি রোপণ করা হয়েছে, যাতে কৃষকরা সহজেই গাছের বৃদ্ধি, উচ্চতা, শীষের গঠন, রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সম্ভাব্য ফলনের পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এর ফলে কৃষকরা তাদের নিজ নিজ এলাকার জন্য উপযোগী ধানের জাত নির্বাচন করতে সক্ষম হবেন।

এই রাইস গার্ডেন স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। প্রতিদিনই অনেক কৃষক ও আগ্রহী ব্যক্তি এখানে এসে বিভিন্ন জাতের ধান পর্যবেক্ষণ করছেন।

কৃষক মো: রফিকুল ইব্রাহিম বলেন, ‘এ ধরনের রাইস গার্ডেন আগে কখনো দেখা যায়নি। একসাথে এতগুলো জাত দেখে বাস্তব ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। যা ভবিষ্যতে উপযোগী জাত নির্বাচন করতে সহায়তা করবে।’

ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, চট্টগ্রামের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোসা: আমিনা খাতুন জানান, এই রাইস গার্ডেনের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল ধানের জাতের চাষাবাদ সম্প্রসারণ সহজ হবে, যা উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন ধানের জাতের কার্যকারিতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যা ভবিষ্যতে কৃষি প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।’

প্রকল্প পরিচালক ড. মো: আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘রাইস গার্ডেন মূলত একটি জীবন্ত গবেষণা ক্ষেত্র, যেখানে একইসাথে বহু জাতের ধান পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা সম্ভব। বোরো মৌসুমে চাষাবাদের উপযোগী এখন পর্যন্ত ব্রি কর্তৃক ৬১টি ধানের জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্য থেকে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর চারিয়া প্রযুক্তি গ্রামে ৫৬টি জাত প্রদর্শন করা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ফলন, জীবনকাল, গাছের উচ্চতা, চালের গুণাগুণ ও বাজারমূল্যসহ বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার জন্য সবচেয়ে উপযোগী জাত নির্বাচন করা সম্ভব হবে, যা ভবিষ্যতে গবেষণা ও কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

সার্বিকভাবে, রাইস গার্ডেন কৃষকদের জন্য একটি কার্যকর প্রদর্শনী ও শিক্ষণীয় ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি মাঠ পর্যায়ে গবেষণা, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং কৃষকের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এর মাধ্যমে কৃষকরা আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণে আরো উদ্বুদ্ধ হবেন এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।