এমসি কলেজে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ: একজনের মৃত্যুদণ্ড, তিনজনের যাবজ্জীবন

২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় স্বামীর সাথে প্রাইভেটকারে করে শাহপরান (রহ.) মাজার এলাকায় বেড়াতে যান এক নববধূ। ফেরার পথে টিলাগড়ে এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি থামালে কয়েকজন যুবক তাদের জিম্মি করে গাড়িসহ কলেজ ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। সেখানে স্বামীকে মারধর করে বেঁধে রেখে নববধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়।

সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
রায়ের পর দণ্ডিতদের কারাগারে নেয়া হচ্ছে
রায়ের পর দণ্ডিতদের কারাগারে নেয়া হচ্ছে |নয়া দিগন্ত

বহুল আলোচিত সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে নববধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সাথে চার আসামিকে খালাস দেয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এ রায় ঘোষণা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন।

রায়ে শাহ মাহবুবুর রহমান (রনি), তারেকুল ইসলাম (তারেক) ও অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে আইনুদ্দিন (আইনুল), মিসবাউল ইসলাম (রাজন), রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমানকে খালাস দেওয়া হয়।

রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সকালেই কারাগার থেকে আট আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। এর আগে গত ৮ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের জন্য ১৪ জুলাই দিন ধার্য করেন।

রায়ের পর আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহ মোশাহিদ আলী অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য নেই এবং ভুক্তভোগীও তাদের শনাক্ত করেননি। অপরাধ প্রমাণিত হয়নি দাবি করে তিনি জানান, এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।

দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা সেই ঘটনা
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় স্বামীর সাথে প্রাইভেটকারে করে শাহপরান (রহ.) মাজার এলাকায় বেড়াতে যান এক নববধূ। ফেরার পথে টিলাগড়ে এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি থামালে কয়েকজন যুবক তাদের জিম্মি করে গাড়িসহ কলেজ ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। সেখানে স্বামীকে মারধর করে বেঁধে রেখে নববধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হলে ভুক্তভোগীর স্বামী শাহপরান থানায় মামলা করেন। অভিযোগ ওঠে, অভিযুক্তরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী হওয়ায় প্রথমদিকে পুলিশ ছাত্রাবাসে প্রবেশে বিলম্ব করে। এ সুযোগে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। পরে অভিযান চালিয়ে ছাত্রাবাসের বিভিন্ন কক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

ঘটনার তিন দিনের মধ্যে পুলিশ ও র‌্যাব আট আসামিকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। ডিএনএ পরীক্ষায় আট আসামির মধ্যে ছয়জনের নমুনার মিল পাওয়া যায়।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া
২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর চালঞ্চল্যকর এই ধর্ষণ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা ও মহানগর পুলিশের শাহপরান থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য।

অভিযোগপত্রে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজনকে দল বেঁধে ধর্ষণের জন্য অভিযুক্ত করা হয়। আসামি রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুমকে ধর্ষণে সহায়তা করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। তারা সবাই ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিতি।

অভিযুক্ত ৮ জনকেই কলেজ কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও এই ৪ জনের ছাত্রত্ব ও সার্টিফিকেট বাতিল করে। আর ছাত্রাবাস থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সাইফুর রহমান ও শাহ মাহবুবুর রহমান রনিকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

জানা গেছে, ২০২০ সালের ২২ নভেম্বর অস্ত্র ও চাঁদাবাজি মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এরপর ধর্ষণ মামলায় ওই বছরের ৩ ডিসেম্বর ৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র প্রদান করা হয়। এরপর ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মোহিতুল হক চৌধুরী মামলার অভিযোগ গঠন করে বিচার কাজ শুরু করেন। আর ২০২২ সালের ১১ মে মাসে একই আদালতে অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলার অভিযোগ গঠন করে আদালত।

ধর্ষণ মামলার অভিযোগ গঠনের পর ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেছিলেন আদালত। তবে ওই বছরের ২৪ জানুয়ারি আদালতে দুটি মামলার বিচার কার্যক্রম একসাথে শুরুর আবেদন করেন বাদীপক্ষ। শুনানি শেষে বিচারক আবেদনটি খারিজ করে দেন। এরপর বাদীপক্ষ এই আবেদন জানিয়ে উচ্চ আদালতে একটি ফৌজদারি বিবিধ মামলা করেন। ওই বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ভার্চুয়াল বেঞ্চ মামলা দু’টির বিচার কার্যক্রম এক সাথে একই আদালতে সম্পন্নের আদেশ দেন। এরপর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বদলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা দুটির কার্যক্রম চালানোর আবেদন করেন বাদীপক্ষ।

বাদীর আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ গঠনের দীর্ঘদিন পরও সাক্ষ্যগ্রহণের শুরু না হওয়ায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা দুটির কার্যক্রম চালানোর জন্য ২০২২ সালের ১ আগস্ট বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে বাদি একটি রিট করেন। ওইবছরের ১৬ আগস্ট রিটের শুনানি শেষে দুই মামলার কার্যক্রম দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বদলির প্রক্রিয়া গ্রহণে কেন নির্দেশনা দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

এর আগে ২০২২ সালের ২৭ জুলাই আসামি রবিউল ইসলামের জামিন শুনানিতে মামলার বিচার বিলম্বিত হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেন বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজলের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ কেন শুরু করা হয় না মর্মে রাষ্ট্রপক্ষকে ২০২২ সালের ২১ আগস্ট কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহিতুল হক।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় পটপরিবর্তনের পর মামলাটি গত বছরের মে মাসে দ্রুত নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল থেকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর হয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। মামলায় ২৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ওই গৃহবধূ, তার স্বামী, আসামিদের স্বীকারোক্তি নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, এমসি কলেজের অধ্যাপক, ওসমানী হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক রয়েছেন।

এই রায়ের মাধ্যমে প্রায় পাঁচ বছর নয় মাস ধরে চলা দেশের অন্যতম আলোচিত এ মামলার বিচারিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। তবে আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে আপিলের ঘোষণা দেয়ায় মামলার আইনি লড়াই এখনো শেষ হয়নি।