প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বেলা রানী দেব প্রায় চার দশক ধরে একই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনের প্রথম পাঠের সাথে জড়িয়ে থাকা সেই শিক্ষককে বিদায়ের দিনে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় ভিন্নধর্মী সংবর্ধনা দিয়েছেন সাবেক শিক্ষার্থীরা। সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়ি, বাদ্যযন্ত্র আর শতাধিক শিক্ষার্থীর শোভাযাত্রায় প্রিয় শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দেয়া হয়।
সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেলে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার মুন্সীবাজার ইউনিয়নের বালিগাঁও গ্রামের বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের আয়োজনে এ বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়।
বিদায়ী শিক্ষক বেলা রানী দেব ১৯৮৭ সালের ৮ নভেম্বর সহকারী শিক্ষক হিসেবে বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন। দীর্ঘ ৩৯ বছর একই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শেষে কর্মজীবনের ইতি টানেন তিনি। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান করেছেন। তাদের অনেকের জীবনের শুরুর শিক্ষার স্মৃতির সাথে জড়িয়ে আছেন এই শিক্ষক।
সাবেক শিক্ষার্থীদের আয়োজনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী অভিভাবক ও সহকর্মীরা অংশ নেন। প্রিয় শিক্ষককে ফুল ও বিভিন্ন উপহার দিয়ে শুভেচ্ছা জানান তারা। দীর্ঘদিনের শিক্ষককে বিদায় দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বেলা রানী দেবসহ উপস্থিত অনেকেই।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে শুরু হয় ব্যতিক্রমী বিদায়যাত্রা। বেলা রানী দেবকে রকিং চেয়ারে বসিয়ে প্রতীকীভাবে শূন্যে ভাসিয়ে নেয়ার পর তাকে তোলা হয় সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে। সামনে মোটরসাইকেল পেছনে শতাধিক শিক্ষার্থীর শোভাযাত্রা। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে বিদ্যালয় থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে তার বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে বহর।
পথজুড়ে ছিল শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপস্থিতি। সাবেক শিক্ষার্থীদের এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনে আবেগঘন হয়ে ওঠে পুরো বিদায়যাত্রা। শিক্ষার্থীদের কাছে এটি ছিল শুধু একজন শিক্ষকের অবসর উপলক্ষে বিদায় নয়; বরং দীর্ঘদিনের প্রিয় একজন মানুষকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় বিদায় জানানোর আয়োজন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: আব্দুল জলিল তালুকদার, ইউআরসির ইন্সট্রাক্টর মো: আতিউর রহমান ও উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আরতি ব্যানার্জি।
অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতি রাজনগরের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিম, সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মাহিদুর রহমান ও বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুমেনা বেগম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গৌরাঙ্গ চন্দ্র ধর।
বিদায়ী অনুষ্ঠানের আয়োজকদের অন্যতম সদস্য ওই বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আব্দুর রব বলেন, শিক্ষিকা বেলা রানী আমাদের মাতৃস্নেহে পড়াশোনা করাতেন। তিনি আমাদের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবেন।
আয়োজকদের আরেক সদস্য তুহিন জুবায়ের বলেন, আজকের দিনটি আমাদের কাছে অন্যরকম মনে হচ্ছে। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মধ্য যে মেলবন্ধন তা ফুটে উঠেছে।
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার বলেন, একজন শিক্ষককে সম্মান জানিয়ে সাবেক শিক্ষার্থীদের এমন আয়োজন প্রশংসনীয়। এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে অনুপ্রাণিত করবে।
৩৯ বছরের কর্মজীবনের শেষে বেলা রানী দেব বিদায় নিলেও তার সাথে শিক্ষার্থীদের সম্পর্কের যেন শেষ হলো না। ঘোড়ার গাড়িতে চার কিলোমিটারের সেই বিদায়যাত্রা হয়ে থাকলো শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ভালোবাসা শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার এক অনন্য স্মৃতি।



