ব্রিজ আর সড়কের অভাবে লেখাপড়া ও বিবাহ-শাদি করার সংকটে চরাঞ্চলের ৩০ হাজার মানুষ। ছাত্র-ছাত্রী, কৃষক, শিক্ষক সকলে কাঠের নড়বড়ে সাঁকোর ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে পার হচ্ছে। নিচে বয়ে চলা তিস্তা শাখা নদীর দিকে তাকালেই মনে জাগে অনেক ভয়, তবুও এ পথই প্রতিদিন তাদের যাওয়া-আসার একমাত্র ভরসা।
স্থায়ী ব্রিজ না থাকায় প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয় এই তিস্তা শাখা নদী। সামান্য অসতর্কতাই ডেকে আনতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। তবুও বাধ্য হয়েই এই অনিশ্চয়তার মধ্যে চলতে হয় চরাঞ্চলের মানুষকে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের চর বেলকা, চর চরিতাবাড়ী, জিগাবাড়ী, কাশিম বাজার, বজরা, উজান চেওড়া, চর বজরা ও মহিষবান্দিসহ আরও কয়েকটি গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা কাঠের তৈরি সাঁকো। তিস্তা শাখা নদীর ওপর স্থায়ী কোনো সেতু না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাঠের তৈরি সাঁকো দিয়েই প্রতিদিন পারাপার করেন প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। বছরের পর বছর ধরে একটি স্থায়ী সেতুর দাবি উঠলেও বাস্তবে মেলেনি ব্রিজের কোনো সমাধান।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বেলকা ইউনিয়নের চর চরিতাবাড়ি গ্রামের মাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের গ্রামের কয়েক শতাধিক পরিবারের চলাচলের একমাত্র ভরসা একটি কাঠের সাঁকো। সেই সাঁকো বেয়ে উঠতে হচ্ছে শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের। কাঠের সাঁকোর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। অনেক কাঠ পচে গেছে, বিভিন্ন জায়গার পাটাতন উঠে গিয়ে বড় বড় ফাঁকা তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও দড়ি দিয়ে কাঠ বেঁধে কোনোভাবে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। একসঙ্গে দুজন মানুষ উঠলেই দুলদুল করে দুলতে শুরু করে পুরো সাঁকো।’
এমন জরাজীর্ণ কাঠের সাঁকোই প্রায় ৩০ হাজার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা।
স্থানীয়দের জানামতে, প্রায় ৪০ বছর ধরে তারা একটি স্থায়ী সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন। নির্বাচন এলেই জনপ্রতিধিদের কাছ থেকে সেতু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মিললেও পরে আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। ফলে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে সাধারণ মানুষের মাঝে।
৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম জানাল, ভাঙাচোরা চরাট দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যেতে হচ্ছে। এক হাতে বই আরেক হাত দিয়ে চরাট ধরে ধীরে ধীরে চলতে হয়। প্রতিদিন এই পথ পার হতে তার খুব ভয় লাগে, তবে বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় বাধ্য হয়েই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করতে হয়। পাকা সেতু থাকলে তার মতো আরও অনেক শিক্ষার্থীর কষ্ট হতো না।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল আউয়াল প্রতিদিন নদীর ওপারে জমিতে কাজ করতে যান। হাতে কৃষি সরঞ্জাম আর কাঁধে ফসলের বোঝা নিয়ে এই কাঠের সাঁকো পার হতে হয়। তিনি বলেন, “ভয় তো সবসময়ই লাগে। কিন্তু উপায় কী? এই সাঁকো ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা নেই যে সেই রাস্তা দিয়ে নদী পার হব। এখন বর্ষাকাল, তাই আরো ভয়ংকর অবস্থা হয় সাঁকো পারাপার হতে। তবুও জীবন বাজি রেখে চলাচল করতে হচ্ছে।’
শুধু যাতায়াত নয়, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা এখন প্রভাব ফেলছে সামাজিক জীবনেও। এলাকাবাসী জানান, সেতু ও পাকা সড়কের অভাবে সন্তানের লেখাপড়া এমনকি বিয়ে দিতে গেলেও অনেকে ভালো চোখে দেখে না। আবার অনেক পরিবার যোগাযোগের দুর্ভোগের কথা শুনে বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে নেয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী নবিয়াল বলেন, একটি পাকা সেতু নির্মিত হলে পুরো এলাকার জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির চেহারা বদলে যেত। বর্তমানে যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় কৃষিপণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রম নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়ে থুবড়ে পড়েছে।
বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ জানান, জরাজীর্ণ কাঠের সাঁকোটি আমি ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে সংস্কার করেছি। ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো নতুন কাঠ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, পাশাপাশি যেসব জায়গায় পাটাতন উঠে গেছে সেগুলো পুনরায় মেরামত করা হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে চরাঞ্চলের মানুষ। এখানে ব্রিজ ও পাকা রাস্তা হওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। ব্রিজ ও পাকা রাস্তা হলে এলাকার মানুষের জীবনযাপন স্বাভাবিক হবে এবং সমাজের সাথে মিলেমিশে চলতে পারবে।
গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাজেদুর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি জানান, বেলকা তিস্তা শাখা নদীর উপর ব্রিজের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে ডিও লেটার দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি বেলকা ব্রিজসহ আরও কয়েকটি ব্রিজের ব্যাপারে মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে দেখা করে কথা বলেছি। তিনি আমাকে ব্রিজ দেওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন। খুবই দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্রিজের বরাদ্দ পাব ইনশাআল্লাহ।’



