ফটিকছড়িতে অর্ধশতাধিক ইটভাটায় ঝুঁকিতে প্রাণ-প্রকৃতি

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব অবৈধ ও পরিবেশবিধ্বংসী ইটভাটা ইতোমধ্যেই নদী, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং সামগ্রিক প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি করে ফেলেছে।

Location :

Fatikchhari
পরিবেশবিধ্বংসী ইটভাটা
পরিবেশবিধ্বংসী ইটভাটা |নয়া দিগন্ত

ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অর্ধশতাধিক ইটভাটা নির্বিঘ্নে পরিবেশ ধ্বংসের ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। এসব ভাটায় সংরক্ষিত বনের মূল্যবান কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সরাসরি আইন লঙ্ঘন। শুধু তাই নয়, কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি (টপসয়েল) কেটে নেয়া হচ্ছে ইটের কাঁচামাল হিসেবে। নদীতীর ও হালদা নদীর পাড়-তলদেশ থেকেও অবাধে মাটি ও বালি সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফলে কৃষিজমির উর্বরতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হচ্ছে এবং প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও ধুলাবালির প্রাদুর্ভাবে ফটিকছড়ির বাতাস দূষিত হয়ে পড়ছে। এই ধোঁয়া ও ধুলো স্থানীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব অবৈধ ও পরিবেশবিধ্বংসী ইটভাটা ইতোমধ্যেই নদী, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং সামগ্রিক প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি করে ফেলেছে।

পরিবেশ অধিদফতরের তথ্যমতে, উপজেলায় মোট ৫১টি ইটভাটা রয়েছে, যার কোনোটিরই বৈধ পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। সরেজমিনে দেখা গেছে, হারুয়ালছড়ি, পাইন্দং, কাজিরহাট ও খিরামসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে একতা ব্রিকস, এবি ব্রিকস, গ্রামীণ ব্রিকস, দাদা ব্রিকস, এমবি ব্রিকসসহ বেশ কয়েকটি ভাটায় প্রকাশ্যে সংরক্ষিত বনের কাঠ মজুত করা হয়েছে এবং তা ইট পোড়ানোর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

২০১৩ সালের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুসারে, ইট পোড়ানোর জন্য কয়লা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ভাটা মালিক এই নিয়ম মানছেন না। আইনের ধারা ৮-এ স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে আবাসিক এলাকা, সংরক্ষিত বন, কৃষিজমি, জলাভূমি ও প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকায় ইটভাটা স্থাপন। অথচ ফটিকছড়ির প্রায় সব ইটভাটাই এসব বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করে চলছে।

সম্প্রতি হারুয়ালছড়িতে পরিবেশ অধিদফতর ও প্রশাসনের যৌথ অভিযানে কয়েকটি ভাটার চিমনি ভেঙে দেয়া হয়। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নতুন চিমনি নির্মাণ করে আবার শুরু হয়েছে পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভাটা মালিক জানান, প্রতি মৌসুমে কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে নেয়া হয়। অভিযানের খবর পেলে কাঠ সরিয়ে কয়লা সাজিয়ে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে রাতের আঁধারে কাঠ পরিবহন করা হয়।

তাদের দাবি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে ভাটা স্থাপনে কোটি টাকা খরচ হলে বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক বলেন, ‘ফটিকছড়ির মাটি অত্যন্ত উর্বর ও প্রাকৃতিকভাবে শক্তিশালী। জমির উপরের স্তরের এই টপসয়েলই ফসলের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। এই মাটি অপসারণ করা কৃষির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম জানান, প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। টপসয়েল কাটার ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের জরিমানা ও কারাদণ্ড দেয়া হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রামের রিসার্চ অফিসার মো: আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘অধিকাংশ ভাটার লাইসেন্স নেই বা মেয়াদোত্তীর্ণ। লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে নয়টি ভাটার চিমনি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং অচিরেই বাকিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো: সফিকুল ইসলাম এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।