কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়া উপকূল দিয়ে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মানবপাচার বেড়েই চলেছে। সঙ্ঘবদ্ধ এই অপরাধচক্রের সাথে জড়িত হোতাদের চিহ্নিত ও সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করতে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মত দিয়েছেন টেকনাফ ও উখিয়ার সাংবাদিকেরা।
মানবপাচার, অভিবাসী চোরাচালান এবং সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত অভিবাসন সম্পর্কে দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশে স্থানীয় সাংবাদিকদের সক্ষমতা বাড়াতে আয়োজিত কর্মশালায় এমন মত উঠে এসেছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের উদ্যোগে এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের অর্থায়নে রোববার (২৬ জুলাই) টেকনাফের সেন্ট্রাল রিসোর্ট কনফারেন্স রুমে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে সাংবাদিকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে টেকনাফ ও উখিয়ার ৪২ সাংবাদিক অংশ নেন।
কর্মশালায় অভিবাসনের বর্তমান প্রবণতা এবং মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের পরিবর্তিত চিত্র নিয়ে মূল উপস্থাপনা করেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান।
মানবপাচার নিয়ে নিজের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি মানবপাচার কিংবা মাদকের মতো সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, একদিন আপনার-আমার সন্তানরাও এর শিকার হবে। তখন দেখবেন এই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে। কাজেই পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঠিক দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
শরিফুল হাসান বলেন, ‘দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা শুধু তথ্য তুলে ধরে না, এটি মানুষকে সচেতন করে, ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখে এবং নিরাপদ অভিবাসনের সতর্কতা ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’
কর্মশালায় মানবপাচারের তদন্ত, অপরাধচক্রের কার্যক্রম এবং এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোমেনা আক্তার।
তিনি বলেন, ‘মানবপাচার থেকে কি রাষ্ট্র লাভবান হয়? ফরেন কারেন্সি আসে? দেশের অর্থনীতি লাভবান হয়? আমরা ভাবছি একবার যেতে পারলে দেশে টাকা আসে। কিন্তু আসলে কি আসে? আসলে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় হ্রাস পায়, অর্থটা বিদেশেই রয়ে যায়। পাচারের অর্থে পাচারকারী দলের শক্তি বৃদ্ধি পায়। পাচারের অর্থ মাদকের মতো ক্ষতিকর পণ্য ক্রয়ে ব্যবহৃত হয় আর তা বাংলাদেশের ভেতরেই আসে। আর সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।’
মোমেনা আক্তার আরো বলেন, ‘আমাদের একার পক্ষে কি এটা প্রতিরোধ সম্ভব? এটা আপনার-আমার সবার বিষয়। সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিষয়। আর এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকা অনেক বেশি। এই কর্মসূচিতে যদি একজন সাংবাদিকও সচেতন হন, তাহলে একজনের হলেও জীবন বাঁচবে। নিজের জায়গা থেকে চিন্তা করতে হবে—আমার ছেলে হলে কী হতো?’
সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস রানা তার তিন দশকের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ‘আমরা একদম ঘাটের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছি, যে ঘাট থেকেই সমুদ্রপথে মানবপাচার হচ্ছে। অর্থাৎ আমরা মানবপাচারের মূল জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। আমরা সাংবাদিকরা কক্সবাজারের সীমানা রক্ষা করতে পারছি না। আন্দামান হয়ে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের ট্রলারডুবির ঘটনা নিয়ে বিদেশী সংস্থায় আগে রিপোর্ট হলো। আমাদের এত ভয় কিসের? ভয় পেলে চলবে না। এখানে আমাদের অনেক দায়িত্ব।’
কক্সবাজারের মানবপাচারের মামলাগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরেন বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের কক্সবাজারের কোঅর্ডিনেটর (লিগ্যাল সার্ভিস) বিশ্বজিৎ ভৌমিক। কর্মশালায় মানব পাচারের শিকার হয়ে ফিরে আসা টেকনাফের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাবের তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
কর্মশালায় মানবপাচার, অভিবাসী চোরাচালান ও অনিয়মিত অভিবাসনের পার্থক্য, বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর হয়ে পরিচালিত ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথের বাস্তবতা, স্থানীয় প্রেক্ষাপট, নৈতিক সাংবাদিকতা, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক প্রতিবেদন এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মূল হোতাদের ধরতে হবে
টেকনাফে বিকেলে ‘সমুদ্রপথে মানবপাচার প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আরও একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। সেখানে পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোমেনা আক্তার বলেন, মানবপাচার ও মাদকের মতো অপরাধের সাথে জড়িত মূল হোতাদের ধরতে হবে। কর্মশালায় কক্সবাজারের উখিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: রকিবুল হাসান, র্যাব-১৫-এর সহকারী পুলিশ সুপার সোহেল রানা বক্তব্য রাখেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম টেকনাফকে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের একটি ‘রেড জোন’ হিসেবে উল্লেখ করে এ অঞ্চলে সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধচক্র মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ আরো জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা সমুদ্রপথে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আন্তঃসংস্থার সমন্বয়, ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ ও সেবা প্রদান এবং পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন।
কর্মশালায় বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), আনসার ও ভিডিপিসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।



