প্রকৃতির অপার বৈচিত্র্যে সৃষ্টিকর্তার এক অনন্য সৃষ্টি ‘কণ্ঠী নিম প্যাঁচা’। নিশাচর এই পাখিটি সাধারণত ঘন পাতাযুক্ত গাছের ডালে এমনভাবে ছদ্মবেশ ধারণ করে থাকে যে দিনের বেলায়ও তাকে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। গাছের ছাল কিংবা শুকনো পাতার রঙের সাথে নিজেকে মিশেয়ে রেখে শিকারি ও মানুষের চোখ এড়িয়ে চলাই এদের স্বভাব।
পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘কণ্ঠী নিম প্যাঁচা’ মূলত বন-জঙ্গল, ঝোপঝাড়, পার্ক, বাগান, এমনকি শহরেও বসবাস করে। এটি আমাদের দেশের বিরল দর্শন আবাসিক পাখি। দিনের বেলা বনে বা গাছের পাতার আড়ালে বড় গাছের কোটরে লুকিয়ে থাকে। এই কারনে দেশজুড়েই এদের উপস্থিতি থাকলেও দেখা পাওয়া মুশকিল।
এই প্রজাতির পাখি গাছের গর্তে বাসা বেঁধে তারা সাধারণত তিন থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে। শান্ত ও মৃদু স্বরের ডাক, কমলা ও বাদামী চোখ এবং মাথায় ছোট কানের ঝুঁটি এই পাখির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পুরুষ ও স্ত্রী প্যাচাঁকে দেখতে প্রায় একই রকম লাগে।
খাদ্যাভ্যাসের দিকে থেকে এরা উপকারী পাখি। পোকা-মাকড়, ফড়িং, ইদুর, ব্যাঙ, সাপ, গুবরের পোকা, ছোট পাখি খেয়েই তারা বেঁচে থাকে। এছাড়া প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এদের দেখা মিললেও বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও চীনে এদের বিস্তৃতি রয়েছে। আংশিক পরিযায়ী হওয়ায় শীত মৌসুমে কিছু পাখি শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমায়।
সম্প্রতি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে এই বিরল পাখির দেখা পাওয়া গেছে। চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে স্থানীয় প্রকৃতিপ্রেমী ও সৌখিন ফটোগ্রাফার তারিক হাসান অপু তার ক্যামেরায় ‘কন্ঠী নিম প্যাঁচা’টি বন্দি করেন।
তিনি জানান, নিজের বাড়ির বারান্দায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার সময় হঠাৎ পাশের পেয়ারা গাছে নজর যায়। কাছ থেকে লক্ষ্য করে দেখা যায়, সেখানে এক সাথে তিনটি প্যাঁচা বসে আছে।
তারিক হাসান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘জীবনে অনেক পাখির ছবি তুলেছি, কিন্তু এই প্রজাতির প্যাঁচা আগে কখনো দেখিনি। একসাথে তিনটি প্যাঁচাকে দেখে নিজেকে সামলাতে পারিনি, তৎক্ষনাৎ ক্যামেরাবন্দি করি। এমন একটি মুহূর্ত পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয়।’
পরিবেশকর্মী ও বার্ড ফটোগ্রাফার খোকন থৌনাওজাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এ ধরনের পাখির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আবাসস্থল ধ্বংস ও পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে অনেক প্রজাতির পাখিই আজ হুমকির মুখে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পাখির আবাসস্থল ধ্বংসের কারনে এই পাখি জনবসতিপূর্ণ জায়গায় প্রজনন করতে দেখা যায়, যা বেশ উদ্বেগজনক। শ্রীমঙ্গলে ‘কণ্ঠী নিম প্যাঁচা’র দেখা পাওয়া প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক আনন্দের খবর। বিরল এই পাখির উপস্থিতি প্রমাণ করে, এখনো প্রকৃতি তার সৌন্দর্য আর রহস্য নিয়ে আমাদের আশপাশেই বেঁচে আছে।’



