চুয়াডাঙ্গায় বর্ষায় জমে উঠেছে মাছ ধরার ফাঁদ ‘বিত্তি’

কারিগররা জানান, সরকারি বা বেসরকারিভাবে করাত, হাতুড়ি ও সুতার মতো কাঁচামাল কিংবা সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা পেলে ঐতিহ্যবাহী এই কুটির শিল্পটি টিকিয়ে রাখা সহজ হতো।

এফ এ আলমগীর, চুয়াডাঙ্গা

Location :

Chuadanga
বাজারে বিক্রির জন্য বিত্তি আনা হয়েছে
বাজারে বিক্রির জন্য বিত্তি আনা হয়েছে |নয়া দিগন্ত

টানা বর্ষণে থৈথৈ করছে নদ-নদী, খাল-বিল ও নিচু এলাকা। জমে থাকা নতুন পানিতে উঁকি দিচ্ছে পুঁটি, চিংড়ি, টেংরা, শিং, বাইনসহ নানা প্রজাতির দেশীয় ছোট মাছ। আর এই নতুন পানিতে মাছ শিকারের আনন্দ ও বাড়তি আয়ের সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি নন চুয়াডাঙ্গার বাসিন্দারা। ফলে জেলাজুড়ে এখন ব্যাপক কদর বেড়েছে ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার বিশেষ ফাঁদ ‘বিত্তি’ ও জালের। বর্ষার আগমনী বার্তায় চুয়াডাঙ্গার গ্রামীণ জনপদে জমে উঠেছে বিত্তি তৈরি ও বিক্রির ধুম।

জেলা মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গার চারটি উপজেলায় প্রায় ২০০ পরিবার বংশপরম্পরায় বিত্তি তৈরির শিল্পের সাথে জড়িত। শ্রাবণের টানা বৃষ্টিতে মাঠ-ঘাট প্লাবিত হওয়ায় এবার বিত্তির চাহিদা বিগত যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি। ফলে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্রামগুলোতে নারী-পুরুষ হাতে হাত রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন বাঁশ চেরা ও বিত্তি বুননের কাজে।

কারিগরদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিত্তি তৈরির প্রধান উপাদান বাঁশ, তালের আঁশ ও নাইলনের সুতা। গ্রামের গৃহস্থদের কাছ থেকে প্রতি পিস ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বাঁশ কিনে তা থেকে চিকন কাঠি বের করা হয়। তালের গাছের ডাল কয়েকদিন পানিতে ভিজিয়ে রেখে তা থ্যাঁতলে বের করা হয় মজবুত সুতা। ভালো মানের একটি বাঁশ থেকে অন্তত চার থেকে ছয়টি ছোট-বড় বিত্তি তৈরি হয়। আকার ভেদে প্রতি পিস বিত্তি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা দামে।

জেলার দর্শনা পৌরসভার রামনগর কালিদাসপাড়ার কারিগরদের তৈরি বিত্তির মান ভালো হওয়ায় এর চাহিদা অনেক বেশি। কারিগরদের মতে, এই শিল্প মূলত বর্ষানির্ভর। বছরের অন্য সময় তেমন কাজ না থাকায় আর্থিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটাতে হয়।

কারিগররা জানান, সরকারি বা বেসরকারিভাবে করাত, হাতুড়ি ও সুতার মতো কাঁচামাল কিংবা সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা পেলে ঐতিহ্যবাহী এই কুটির শিল্পটি টিকিয়ে রাখা সহজ হতো।

জেলার ঐতিহ্যবাহী দামুড়হুদার ডুগডুগি পশুহাট ও জীবননগরের শিয়ালমারি পশুহাটে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। পাইকারি ও খুচরা—উভয়ভাবেই বেচাকেনা চলছে এই হাটে।

শিয়ালমারি হাটের বিত্তি ব্যবসায়ী নাসের আলী বলেন, ‘দাদার আমল থেকেই আমরা এই পেশায় আছি। তবে এবার চাহিদা বেশি হওয়ায় অনেকেই নতুন করে মাছ ধরার ফাঁদ বিক্রির সাথে যুক্ত হচ্ছেন।’

হাটে আসা বিত্তি ক্রেতা ফারুক হোসেন ও আনিসুর রহমান জানান, বর্ষায় মাঠে কাজ বন্ধ থাকায় ঘরে বসে না থেকে বিত্তি দিয়ে মাছ ধরে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বিলে পানি কানায় কানায় ভরা থাকায় প্রতিদিন নতুন নতুন মাছ মিলছে এসব ফাঁদে।

চুয়াডাঙ্গা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: ফরহাদুর রেজা বলেন, ‘চলতি মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে খাল-বিল ও ডোবাগুলোতে মাছের চলাচল বেড়েছে। বিশেষ করে দেশীয় ছোট মাছ ধরার জন্য বিত্তি বেশ কার্যকরী উপকরণ। স্থানীয়ভাবে এটি উৎপাদিত হওয়ায় যেমন অনেকের কর্মসংস্থান হচ্ছে, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’