টানা ৪ দিন শিলাবৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া

সিলেটে বোরো ফসল নিয়ে শঙ্কা, হাওরপাড়ের কৃষকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ

জেলার পাঁচটি উপজেলায় শিলাবৃষ্টি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ধানের তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে শিলাবৃষ্টি যদি অব্যাহত থাকে তাহলে ধানের ক্ষতি হতে পারে।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
সিলেট কালবৈশাখী ঝড়, ফসলের ক্ষতির সম্ভাবনা
সিলেট কালবৈশাখী ঝড়, ফসলের ক্ষতির সম্ভাবনা |নয়া দিগন্ত

মৌসুমের শুরুতেই কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টির কবলে পড়েছে সিলেট অঞ্চলের বোরো ফসল। সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলজুড়ে প্রায় আট থেকে ১০ লাখ হেক্টরজুড়ে বোরো ফসলের আবাদ হয়।

গত নভেম্বর থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় দীর্ঘ খরার কবলে সিলেট অঞ্চলের বোরো ফসল। খরা কাটিয়ে ফাল্গুন মাসের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (১৩ মার্চ) প্রথম বৃষ্টির দেখা পায় সিলেটের বোরো ফসল। প্রথম দিনেই কালবৈশাখী ঝড় আঘাত হানে, সাথে ছিল শিলাবৃষ্টিও।

বৃহস্পতিবার থেকে সোমবার (১৬ মার্চ) পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড় আঘাত হানার ফলে এবার বোরো ফসল ঘরে তোলা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন এই তিন জেলার হাওরাঞ্চলের কৃষকরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চৈত্রের এমন সময়ে ধান গাছে যখন থোড় বের হচ্ছিল, ঠিক সেই মুহুর্তে কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টির আঘাত কৃষকদের শঙ্কায় ফেলেছে। চলতি মৌসুমের প্রথম কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টি গত বৃহস্পতিবার সিলেট ও মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় আঘাত হানে।

গত শনিবার (১৪ মার্চ) ও গতকাল রোববার (১৫ মার্চ) সিলেট, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ জেলাজুড়ে কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টির এই ধারা অব্যাহত ছিল। ফলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন হাওরপাড়ের কৃষকরা।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বোরো মৌসুমে দীর্ঘ খরার কারণে বোরো ধানের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। দেরিতে হলেও ফাল্গুনের শেষ দিনে বৃষ্টি হলে আশার আলো জাগে কৃষকদের মাঝে। কিন্তু চৈত্র মাসের প্রথম চারদিন টানা কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে কৃষকদের সেই আশা এখন ফিকে হয়ে গেছে।

সুনমাগঞ্জের হাওরপাড়ের কৃষকরা বলছেন, বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে যখন সবুজ ধানগাছগুলো উঁকি দিচ্ছিল, ঠিক তখনই কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে বোরো ধানের গাছ হেলে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

আবহাওয়া অফিসের তথ্য মতে, সিলেট জেলার বিভিন্ন এলাকায় ১৩ মার্চ রাত থেকে ১৫ মার্চ রাত পর্যন্ত ঝড়ো হাওয়ার সাথে ভারী বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি হয়েছে। এতে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় আবাদ করা বোরো ফসলের ধান গাছ হেলে পড়েছে। ঝড়ে অনেক বাসাবাড়ির টিনের চাল উড়ে গেছে, কোথাও কোথাও গাছ ভেঙে পড়েছে।

গত চারদিনে সিলেটে প্রায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। শিলাবৃষ্টিতে সিলেট জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিশেষ করে হাকালুকি হাওরপাড়ের উপজেলার বোরো ফসল ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেটসহ দেশের আটটি বিভাগে বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ সময় দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে। বিশেষ করে সিলেট, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় দমকা ঝড়ো হাওয়া, বিদ্যুৎ চমকানো বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

সুনামগঞ্জে ব্যাপক শিলাবৃষ্টি, ফসল নিয়ে শঙ্কায় হাওরের কৃষক
সুনামগঞ্জে গত তিন দিন ধরে ব্যাপক শিলাবৃষ্টি হয়েছে। এতে হাওরপাড়ের কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও শঙ্কা। বিশেষ করে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতির আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। শনিবার থেকে সোমবার (পর্যন্ত জেলার দিরাই, শাল্লা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় হঠাৎ করেই ঝড়ো হাওয়ার সাথে শুরু হয় শিলাবৃষ্টি। কয়েক মিনিটের তীব্র শিলাবৃষ্টিতে অনেক জায়গায় ধানক্ষেতের গাছ নুয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩৭ হাওরে প্রায় ১০ লাখ কৃষক দুই লাখ ২৩ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ করেছেন। আর মাসখানেক পরই কষ্টের ফলানো এই ধান গোলায় তোলার কথা কৃষকদের। এর মধ্যেই সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত ও বিভিন্ন উপজেলায় শিলাবৃষ্টি শুরু হওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।

হাওরপাড়ের অনেক কৃষক নিজেদের জমিতে গিয়ে ধানের অবস্থা দেখছেন। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, শিলাবৃষ্টি বাড়লে ধানের শিষ ভেঙে যেতে পারে এবং গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়তে পারে।

দিরাই উপজেলার মাইট্টাপুর গ্রামের কৃষক মুতালিব উল্লা বলেন, সারা বছর আমরা এই বোরো ধানের অপেক্ষায় থাকি। অনেক কষ্ট করে চাষ করেছি। এখন যদি শিলাবৃষ্টি বেশি হয়, তাহলে বড় অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কালিপুর গ্রামের কৃষক শফিক আহমেদ বলেন, ধানের শিষ আসতে শুরু করেছে মাত্র। এই সময় ঝড় বা শিলাবৃষ্টি হলে ধান মাটিতে পড়ে যায়। তখন ফলন অনেক কমে যাবে। তাই খুব দুশ্চিন্তায় আছি।

জামালগঞ্জ উপজেলার বড় ঘাগটিয়া গ্রামের কৃষক লতিফ মিয়া বলেন, নিজের কোনো জমি নাই, অন্যের জমিতে আবাদ করেছি। গত রাত ও আজকে সকাল, এই দুইদিনে যে পরিমাণ শিলা বৃষ্টি হয়েছে এবার ধান কতটুকু হবে তা নিয়ে চিন্তায় আছি।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ওমর ফারুক নয়া দিগন্তকে বলেন, জেলার পাঁচটি উপজেলায় শিলাবৃষ্টি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ধানের তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে শিলাবৃষ্টি যদি অব্যাহত থাকে তাহলে ধানের ক্ষতি হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, কৃষি বিভাগ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

এদিকে বিভাগের অপর জেলা মৌলভীবাজারেও কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টি হয়েছে। গত চারদিনে জেলায় ১০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শনিবার ও রোববারও জেলাজুড়ে শিলাবৃষ্টি হয়েছে। এতে শঙ্কায় রয়েছেন দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি হাওরপাড়ের কৃষকরা। জেলার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার বড় একটি অংশজুড়ে বোরো ফসলের আবাদ হয়।