ফটিকছড়িতে কেঁচো সার উৎপাদন, স্বাবলম্বী হচ্ছেন নারীরা

​২০১৬ সালে উষা বালা প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করেন। শুরুতে বিষয়টি স্থানীয়দের কাছে কৌতূহল ও বিস্ময়ের উদ্রেক করলেও উষার অভাবনীয় সাফল্য অল্প দিনেই গ্রামের অন্য নারীদের অনুপ্রাণিত করে।

Location :

Fatikchhari

ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা
সবুজ পাহাড় আর অরণ্যঘেরা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের হাজারীখিল গ্রাম। একসময় এ গ্রামের নারীদের দিন কাটত বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করে তা বিক্রি করা সামান্য আয়ে। সেই অতি পরিচিত দৃশ্যপট এখন অতীত। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর সীমিত সামর্থ্য নিয়ে উষা বালা নামে এক নারী যে সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছিলেন, তা আজ পুরো গ্রামকে দিয়েছে এক নতুন পরিচয়। গ্রামটি এখন এলাকায় ভার্মি গ্রাম হিসেবে সমধিক পরিচিত।

​২০১৬ সালে উষা বালা প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করেন। শুরুতে বিষয়টি স্থানীয়দের কাছে কৌতূহল ও বিস্ময়ের উদ্রেক করলেও উষার অভাবনীয় সাফল্য অল্প দিনেই গ্রামের অন্য নারীদের অনুপ্রাণিত করে। বর্তমানে এই গ্রামের প্রায় ৪০ জন নারী সরাসরি কেঁচো সার উৎপাদনের সাথে যুক্ত। বনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে তারা এখন ঘরে বসেই নিয়মিত আয় করছেন, যা তাদের পরিবারে এনেছে সচ্ছলতা।

সরেজমিনে দেখা যায়, ২০ ফুট দীর্ঘ ও আট ফুট প্রস্থের বিশাল হাউসে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন উষা। তিনি জানান, গোবর সংগ্রহ থেকে শুরু করে সার উৎপাদন পর্যন্ত দুই থেকে আড়াই মাস সময় লাগে। তার খামারে প্রতি মাসে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার কেজি কেঁচো সার উৎপাদিত হয়, যা থেকে অনায়াসেই ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় সম্ভব হচ্ছে।

ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ এখন হাজারীখিলের নারীদের ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রাখছে। গ্রামের সাধারণ গৃহিণীরা এখন সফল উদ্যোক্তা। এ আয় দিয়ে তারা সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাচ্ছেন ও সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়েছেন। উষা এখন নিম্ন আয়ের নারীদের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। তার এ অসামান্য অবদানের জন্য উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কৃত ও স্বীকৃতি দিয়েছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে,​রাসায়নিক সারের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হওয়া ও পিএইচের ভারসাম্যহীনতার ফলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। এ প্রেক্ষাপটে ভার্মি কম্পোস্ট এক আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় ১৭ থেকে ১৮টি পুষ্টি উপাদানের মধ্যে ১৩ থেকে ১৪টিই পাওয়া যায় এ কেঁচো সারে।

ফটিকছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুসারে, পুরো উপজেলায় বর্তমানে ১২৫ জনের বেশি উদ্যোক্তা বছরে ৫০০ থেকে ৬০০ মেট্রিক টন কেঁচো সার উৎপাদন করছেন। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি পাহাড়ের ফলের বাগান, হর্টিকালচার সেন্টার এবং শহরের ছাদবাগানেও এ সারের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। যেখানে রাসায়নিক সারের কেজি প্রতি দাম প্রায় ২৭ টাকা, সেখানে এ উন্নত মানের জৈব সার পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৫ টাকায়। সাশ্রয়ী দাম ও কার্যকারিতার ফলে এ খাত থেকে বছরে প্রায় কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের দাবি, সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদিত সার বিক্রির জন্য একটি সুসংগঠিত বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এ খাতটি দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি আয়েও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।

হারুয়ালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘উষার মতো উদ্যোক্তাদের কারণেই হাজারীখিল গ্রাম আজ স্বনির্ভরতার প্রতীক। আমরা নারীদের এ কাজে আরো উৎসাহিত করছি।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক বলেন, ‘ভার্মি কম্পোস্ট একটি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ জৈব সার যা মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে। আমরা নারীদের কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দিয়েছি যাতে এ খাত আরো বিস্তৃত হয়।’