আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা যেখানে বিশ্বজুড়ে জীবন রক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, সেখানে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় মৌলিক জরুরি চিকিৎসা সেবার অভাবে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
বিশেষ করে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় এন্টিভেনম ও জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন সঙ্কট স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতা ও ব্যবস্থাপনা সঙ্কটকে সামনে নিয়ে এসেছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের ২৮ বছর বয়সী যুবক এইচ এম সায়েম সম্প্রতি বিষধর সাপে দংশনের শিকার হন। দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলেও সেখানে এন্টিভেনম না থাকায় তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে পথেই তার মৃত্যু হয়।
একই ধরনের ঘটনা ঘটে গত ২ মে কেদারপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ভূতেরদিয়া নতুনচর গ্রামের ৬০ বছর বয়সী হানিফ শরীফের ক্ষেত্রে। গরুর ঘাস কাটার সময় সাপে দংশনের পর হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনিও মৃত্যুবরণ করেন।
এ বিষয়ে চাঁদপাশা ইউনিয়নের বাসিন্দা মো: জুয়েল হোসেন বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপে কাটার এন্টিভেনম না থাকার আমার ভাইকে বরিশালে নিয়ে যাই। এতে দেরি হওয়ায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।’
প্রায় ১৬৪.৮৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বাবুগঞ্জ উপজেলায় ১,৫৪,৫১৮ জন মানুষ বসবাস করেন। অথচ এখানে ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকলেও কার্যত ৩০ শয্যার সীমিত সেবা চালু রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—জরুরি জীবনরক্ষাকারী এন্টিভেনম সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপে কাটা রোগীর ক্ষেত্রে প্রথম এক ঘণ্টা ‘গোল্ডেন আওয়ার’, যেখানে সঠিক এন্টিভেনম প্রয়োগ না হলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়।
বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মো: মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার পূর্বসূরি এন্টিভেনমের চাহিদা পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যায়নি। দায়িত্ব নেয়ার পর আমি জেলা সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য অধিদফতরে একাধিকবার চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি।
তিনি আরো জানান, বাংলাদেশে চার ধরনের বিষধর সাপ রয়েছে। বিশেষ করে গোখরা সাপের বিষ দ্রুত স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে এবং এক ঘণ্টার মধ্যেই রোগী সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। তাই দ্রুত এন্টিভেনমই একমাত্র জীবনরক্ষার উপায়।
শুধু সাপ নয়, জলাতঙ্ক (Rabies) প্রতিরোধী ভ্যাকসিন নিয়েও একই ধরনের সঙ্কটের অভিযোগ উঠেছে। আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর সময়মতো ভ্যাকসিন না পেলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত—এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করলেও স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি ওষুধ, সরঞ্জাম ও জীবনরক্ষাকারী ইনজেকশনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে রোগীদের প্রায় ৪০–৫০ কিলোমিটার দূরের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিতে হয়, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী বিলম্ব তৈরি করে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু সরবরাহ সঙ্কট নয়, বরং স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে উপজেলা পর্যায়ে ওষুধ সরবরাহ চেইন, বাজেট বরাদ্দ এবং চাহিদা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এতে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা চাহিদা পাঠালেও তা সময়মতো সরবরাহ না হওয়া একটি বড় প্রশাসনিক ফাঁক হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপে কাটা ও জলাতঙ্ক দুই ক্ষেত্রেই উপজেলা পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা নিশ্চিত না থাকলে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব নয়। এটি শুধু চিকিৎসা নয়, একটি ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত ব্যর্থতার বিষয়।
বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডা: এস এম মনজুর-এ-এলাহী বলেন, জলাতঙ্ক রোগের অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন সেন্ট্রাল পর্যায়ে সঙ্কটে রয়েছে। ইনসেপ্টা কোম্পানি সরবরাহ করছে, কিন্তু তারা বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দিতে পারছে না।
তিনি আরো জানান, সাপে কাটার এন্টিভেনম পর্যাপ্ত রয়েছে এবং দ্রুতই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরবরাহ দেয়া হবে।
বাবুগঞ্জের এই পরিস্থিতি শুধু একটি উপজেলার স্বাস্থ্য সঙ্কট নয়; বরং উপজেলা পর্যায়ের জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।দ্রুত এন্টিভেনম ও জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে এ ধরনের প্রাণহানি রোধ করা কঠিন হবে।



