নিজামুদ্দিন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় না আসলে ভাত খাবেন না। ১১ বছর ৫ মাস ১৫ দিন সেই প্রতিজ্ঞায় অটুটও ছিলেন। কিন্তু সোমবার রাতে প্রতিজ্ঞা, সংসার, দল- সবকিছু ছেড়েই তাকে চিরবিদায় নিতে হয়েছে।
নিজামুদ্দিনের বাড়ি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বাঁশবাড়িয়া গ্রামে এবং ওই গ্রামের মৃত নুর আলী বক্সের ছেলে তিনি। জীবদ্দশায় তিনি বিএনপির একজন একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন তিনি।
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভাত না খাওয়ার অদ্ভুত ও দৃঢ় সংকল্পে জীবনযাপন করা এই বৃদ্ধ বিএনপির প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে রইলেন। জীবনের শেষ ইচ্ছাটুকুও অপূর্ণ রেখেই পৃথিবীর মায়া ছাড়তে হলো তাকে।
নিজামুদ্দিন জীবদ্দশায় বারবার বলতেন, ‘আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, আমার তারেক জিয়া যেদিন দেশে ফিরবেন এবং বিএনপি যেদিন ক্ষমতায় আসবে, সেদিনই আমি ভাত খাব। তার আগে না। এতে আমার জীবন চলে গেলেও কোনো আফসোস নেই।’
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলো, তারেক রহমান দেশে ফিরলেও বিএনপি এখনো ক্ষমতায় আসেনি। আর সেই অপেক্ষার মধ্যেই নিভে গেল নিজামুদ্দিনের জীবনপ্রদীপ। প্রিয় নেতার সাথে একবার দেখা করা কিংবা এক টেবিলে বসে ভাত খাওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে মহেশপুরে বিএনপির একটি দোয়া মাহফিলে রান্নার দায়িত্বে ছিলেন নিজামুদ্দিন। সে সময় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী সেখানে এসে রান্না করা খিচুড়ির হাঁড়িতে লাথি মেরে উল্টে দেন। সেই ঘটনায় চরমভাবে অপমানিত হয়ে সেদিনই নিজামুদ্দিন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন, বিএনপি ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত তিনি আর ভাত খাবেন না। এরপর থেকে তিনি ভাত ছুঁয়েও দেখেননি। অনেকে তাকে ভাত খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন, অনুরোধ করেছেন, অর্থ দিতে চেয়েছেন। কিন্তু কোনো কিছুর কাছেই তিনি নতি স্বীকার করেননি।
পেশায় কাঠমিস্ত্রি নিজামুদ্দিন নিজের পরিশ্রমের আয়েই চলতেন। স্থানীয় বিএনপি কার্যালয়ে নিয়মিত যেতেন। শহীদ জিয়াউর রহমান ও তারেক রহমানের ছবি পরিষ্কার করতেন। তার ভাষায়, ‘দলই আমার পরিবার, জিয়া পরিবারই আমার প্রেরণা। টাকায় আমাকে কেনা যাবে না।’
তার স্বপ্ন ছিল, বিএনপি ক্ষমতায় এলে ছাগল জবাই করে গ্রামবাসীকে ভাত খাওয়াবেন এবং তারেক জিয়ার সাথে এক টেবিলে বসে খাবেন।
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে বিষয়টি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নজরে আসে। তার নির্দেশনায় নিজামুদ্দিনকে ফরিদপুর ও ঢাকায় উন্নত চিকিৎসা দেয়া হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে গ্রামে ফিরলেও পুরোপুরি আর সেরে উঠতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত সোমবার (৫ জানুয়ারি) রাতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
নিজাম উদ্দিনের ছেলে শাহ আলম বলেন, ‘বাবাকে ভাত খাওয়ানোর জন্য পরিবার থেকে বহুবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তিনি বলতেন, প্রতিজ্ঞা ভাঙলে আমি নিজের কাছে ছোট হয়ে যাব। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।’
মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, ‘নিজাম উদ্দিনের এই আত্মত্যাগ দলীয় ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা সবসময় তার পরিবারের পাশে থাকব।’



