ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ‘প্রয়াস’ মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ফোরকান মিয়া (২৯) নামে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। মামলায় নিরাময়কেন্দ্রটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালককে প্রধান আসামি করে সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় আরো চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফনান সুমী সদর থানায় এ ঘটনায় কোনো অপমৃত্যু মামলা ও সাধারণ ডায়েরি হয়েছে কি না, তা যাচাইসহ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে সোমবার নিহতের বাবা আব্দুর রশিদ বাদী হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন।
নিহত ফোরকান জেলার নবীনগর উপজেলার নাটঘর ইউনিয়নের কুড়িঘর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি কাতারপ্রবাসী ছিলেন। প্রায় ছয় মাস আগে ছুটিতে দেশে আসার পর মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার প্রধান আসামি হলেন শহরের ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকার তিনতলা ভবনে অবস্থিত ‘প্রয়াস’ মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মো: ইকরামুল হক ওরফে রুবেল (৪৫)। অন্য আসামিরা হলেন কেন্দ্রটির পরিচালক নরসিংদীর প্রমোদ কুমার বর্মন (৪৬), সহযোগী শহরের কান্দিপাড়ার রিয়াদ আহমদ ওরফে রকসি (২৫), সাথি (৩০), আরিফ (৩২), সাকিব (২৫) ও শাহরিয়ার (৩৩)। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরো চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় গত ১২ আগস্ট ফোরকানকে তিন মাসের জন্য ‘প্রয়াস’ মাদক নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা বাবদ নির্ধারিত ৭০ হাজার টাকার মধ্যে ভর্তির সময় কেন্দ্রটির মালিক ইকরামুল হক ও পরিচালক প্রমোদ কুমার বর্মনকে ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়। বাকি ৫০ হাজার টাকা এক মাসের মধ্যে পরিশোধের কথা ছিল।
ভর্তির পরদিন ফোরকান বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে তার বাবাকে জানান, নিরাময়কেন্দ্রের লোকজন তাকে মারধর করছেন। বিষয়টি যাচাই করতে গত ১৪ আগস্ট ফলমূল নিয়ে ফোরকানকে দেখতে সেখানে যান তার ভাগ্নে মো: আশরাফ।
এজাহারে বলা হয়, আশরাফ যাওয়ার সময় অফিসকক্ষ থেকে ফোরকান দৌড়ে এসে তাকে মারধরের কথা জানান। পরে ইকরামুল হকের নির্দেশে অন্য আসামিরা ফোরকানকে ভেতরে নিয়ে মারধর করেন। এ সময় ফোরকানের চিৎকার শুনে আশরাফ নির্যাতনের কারণ জানতে চাইলে ইকরামুল হক তাকে বলেন, ‘শারীরিক নির্যাতন না করলে মাদকাসক্ত ব্যক্তির নেশা দূর হবে না।’
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, গত ১৮ আগস্ট রাত ৮টা থেকে ১২টার মধ্যে আসামিরা ফোরকানকে পরিকল্পিতভাবে দফায় দফায় অমানুষিক নির্যাতন করেন। একপর্যায়ে তাকে মেঝেতে শুইয়ে কয়েকজন মিলে হাত-পা চেপে ধরে নির্যাতন করা হয়। পরে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে ফোরকানের মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরে জ্ঞান না ফেরায় নিরাময়কেন্দ্রের লোকজন তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এজাহারে আরো বলা হয়, ফোরকানকে নির্যাতন ও তার মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অন্য রোগীরা জানালা ভেঙে পালিয়ে যান।
এর আগে গত ১৮ আগস্ট রাতে ‘প্রয়াস’ মাদক নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ফোরকানকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পরদিন ১৯ আগস্ট দুপুরে স্থানীয় লোকজন ওই কেন্দ্রে ভাঙচুর চালালে সেখানে থাকা ৪০ জন রোগী একসাথে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় সদর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
মামলার এজাহারে আরো অভিযোগ করা হয়েছে, ফোরকানের মৃত্যুর ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদনও আসামিদের ইচ্ছা অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বর্তমানে মামলার আসামিরা পলাতক এবং মাদক নিরাময়কেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে বলে মামলার বাদী অভিযোগ করেছেন।
এদিকে ২০১৪ সালের ৯ আগস্ট শহরের কান্দিপাড়ার আতিকুল ইসলাম ওরফে শাকিল (৩০) নামে এক যুবককে হত্যার পর তার লাশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের বারান্দায় রেখে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছিল ‘প্রয়াস’ মাদক নিরাময়কেন্দ্রের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় মামলাও হয়েছিল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’



