‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ নারী পুরুষ যে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ নারীরা পুরুষের পাশাপাশি দেশের জন্য নিজের শ্রম দিয়ে তা প্রমাণ করে যাচ্ছেন। তারা শুধু এখন পরিবারের মধ্যই সীমাবদ্ধ না।
এমনি এক নারী ৪৬ বছর বয়সী শেফালী বেগম। শেফালীর বয়স যখন সাত মাস তখন তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। সৎ মায়ের সংসারে আটজন সন্তানের মাঝে অবহেলার বড় হতে থাকেন তিনি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে চাকরিজীবী ছেলের সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিন ছেলে-মেয়ের মা হন শেফালী। ভালোই চলছিল পাঁচ সদস্যের সংসার।
২০০৯ সালে স্বামী অবসরে গেলে উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অভাবে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বিপাকে পড়েন শেফালী। তখন কাঁথা সেলাইয়ের কাজ বেছে নেন তিনি। বাড়িতে কাঁথা সেলাই করে শহরে বিক্রি করতেন। এতে প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় শুরু হয়। এ টাকা দিয়ে সংসারের হাল ধরেন। এভাবেই ধুকে ধুকে কেটে যায় আট বছর।
এসময় তার অধীনে কাজ করতেন ২৫ জন নারী। ২০১৮ সালে বাংলাদশে পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডবি) সমন্বতি পল্লী দারদ্র্যি দূরীকরণ প্রকল্পের অধিনে পলাশবাড়ী কার্যালয়ে দুই মাস সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ নেন। ওই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রথমে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন। এরপর বড় পরিসরে যাত্রা শুরু তার।
বর্তমানে তার অধীনে কাজ করছেন ২৫০ জন নারী। খরচ বাদে তার মাসিক আয় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। পাঁচ শতক বসতভিটায় করেছেন পাকা বাড়ি। জমিও কিনেছেন বেশকিছু। এখন একজন সফল নারী উদ্যোক্তা তিনি।
প্রকারভেদে এক একটি নকশীকাঁথা তৈরি করতে মজুরীসহ খরচ হয় দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা। প্রতিটির দৈর্ঘ্য সাড়ে পাঁচ হাত ও প্রস্থ সাড়ে চার হাত। একটি কাঁথা তৈরি করতে একজন নারীর ১৫ দিন সময় লাগে। নকশা করা প্রতিটি কাঁথা বিক্রি করেন আড়াই হাজার থেকে সাড়ে আট হাজার টাকায়। ঢাকা ও রংপুরে এসব নকশীকাঁথা বিক্রি হয়।
শেফালী বেগমের অধীনে কাজ করে পলাশবাড়ী উপজেলার ২৫০ জন দরিদ্র নারী এখন স্বাবলম্বী। প্রতিজন নারী মাসিক চার থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
গৃধারীপুর গ্রামের বিউটি খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী উপজেলা শহরে চায়ের দোকান চালান। দোকানের আয়ে ছয় জনের সংসার চলে না। ২০০০ সাল থেকে এখানে কাজ করছি। প্রতি মাসে গড়ে ছয় হাজার টাকা আয় হচ্ছে।’
একই এলাকার পিংকি রানী বলেন, ‘চার বছর ধরে শেফালী আপার অধীনে কাজ করছি। প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা আয় করছি। এ টাকা দিয়ে সন্তানের লেখাপড়া ও সংসারের যোগান দিচ্ছি।’
পাশ্ববর্তী উদয়সাগর গ্রামের দশম শ্রেণির ছাত্রী মিতু খাতুন বলেন, ‘বাবা-মা ঠিকমতো লেখাপড়ার খরচ যোগাতে পারেন না। তাই পড়াশোনার অবসর সময়ে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করছি। প্রতি মাসে গড়ে চার হাজার টাকা আয় হচ্ছে। তা দিয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছি। মাঝে মধ্যে সংসারেও দিচ্ছি।’
গতবছর ‘অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী’ ক্যাটাগরীতে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতার পুরস্কার পেয়েছেন শেফালী বেগম।
শেফালী বেগম বলেন, ‘নারী দিবস একদিনের জন্য নহে, প্রতিদিন। কারণ একজন নারী তার পরিবার ও রাষ্ট্রের কাছে প্রতিক্ষণে সম্মান পাওয়ার দাবি রাখে। দেশে অনেক পরিশ্রমী নারী দেশ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে কাছ করে যাচ্ছে।’
তিনি বিভিন্ন নারী সংগঠনের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনার নারীদের অধিকার নিয়ে শুধু রাস্তায় প্রতিবাদ না করে, কাজের ব্যবস্থা করে দিন। একজন নারী সমাজের দর্পন। বর্তমানে পরিশ্রমী নারীরা সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে অপরিসীম ভূমিকা পালন করছেন।



