জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সুস্থ হতে পারেননি আহত গাড়িচালক মো: আব্দুল্লাহ বাবু (২৪)। আন্দোলনে আহত হয়ে হারিয়েছেন এক চোখের আলো। অন্য চোখেও ঝাপসা দেখেন। এ অবস্থায় চিকিৎসার ব্যয় বহনের সামর্থ্য না থাকায় এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।
গত বছরের ১৯ জুলাই গৌরীপুরের কলতাপাড়ায় কোটা আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের সময় গুলিবিদ্ধ হন বাবু।
সেদিন কারফিউ ভেঙে সকাল থেকেই গৌরীপুরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দলে দলে বেরিয়ে আসতে শুরু করে শিক্ষার্থীরা। তাদের সাথে একাত্মতা প্রকার করে আন্দোলনে যুক্ত হন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরাও।
তাদের কণ্ঠে ছিল সরকারের পদত্যাগ, বৈষম্যহীন সমাজ চাই, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ চাই। ব্যানার-ফেস্টুনে সয়লাব হয়ে যায় রাজপথ। শিক্ষার্থীদের শ্লোগানে প্রকম্পিত হয় পুরো এলাকা। তখন পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
পুলিশ সদস্যরা সাঁজোয়া যান নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় এবং নির্বিচারে তাদের ওপর রাবার বুলেট ছোড়েন। ওই সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বন্ধুদের সাথে নিয়ে নিয়মিত রাজপথ কাঁপানো স্লোগান দিচ্ছিলেন ময়মনসিংহের গৌরীপুরের মো: আব্দুল্লাহ বাবু। তখন পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেটে তার চোখ ও মুখ গুলিবিদ্ধ হয়।
জানা গেছে, বাবু উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের কলতাপাড়া গ্রামের আব্দুল বারেকের ছেলে। দীর্ঘ একবছর চিকিৎসার পরও তার বাম চোখের দৃষ্টি ফেরানো যায়নি। চিরতরে অন্ধ হয়ে গেছে তার বাম চোখ। ডান চোখেও ঝাপসা দেখছেন তিনি। অর্থাভাবে ডান চোখের চিকিৎসা করাতে পারছেন না বাবুর পরিবার। এর পরও বাবু গর্ববোধ করেন এই ভেবে, তিনি দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছেন।
মো: আব্দুল্লাহ বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমার একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও সান্ত্বনা দেই, দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করতে পেরেছি। জালিম ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায় হয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বহু রক্তের বিনিময়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছি। যদি আমার আরেকটা চোখও নষ্ট হয়ে যেত তাহলেও আমার কোনো দুঃখ থাকত না। এখন আমার ওই এক চোখ দিয়েই নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি স্বপ্ন নিয়ে স্লোগান ধরেছিলাম। সেই স্বপ্ন পূরণে একটি চোখ কেন, জীবন চলে গেলেও আন্দোলন থেকে ফিরে আসতাম না। আমি ঝাপসা চোখেই ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন দেখেছি। এ আমার মহাবিজয়।’
বাবু আরো বলেন, ‘তার বাবা আব্দুল বারেক ছিলেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের নেতা। বাবার সাথে বাবুও বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সাংগঠনিক কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন বাবু। সংসারের অনটনের জন্য ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ইকুরিয়া এলাকায় লেগুনা চালাতেন তিনি। তার আয়ে চলতো পরিবারে পাঁচ সদস্যের ভরণ-পোষণ।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে বাবু ছিলেন মিছিলের অগ্রভাগে। চিকিৎসক বলেছেন, তিনি আর বাম চোখে দৃষ্টি ফিরে পাবেন না। তার ডান চোখেও গুলির আঘাত লাগায় আরো চিকিৎসার প্রয়োজন। তবে চোখের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে তাকে। এজন্য আরো টাকার প্রয়োজন।
জানা গেছে, স্ত্রী নাসরিন প্রীতিসহ মো: আনার মিয়া নামে দেড় বছরের এক শিশুসন্তান নিয়ে চলছে বাবুর সংসার।
মো: আব্দুল্লাহ বাবুর বাবা আব্দুল বারেক বলেন, ‘বাবু তো আর কখনো গাড়ি চালাতে পারবে না। তার একটি কর্মসংস্থান প্রয়োজন। তা না হলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কীভাবে দিন পার করবে।



