ফেনী শহরের একাডেমি এলাকায় যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে বিচার চেয়ে এক কিশোরীর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে ওই কিশোরী অভিযোগ করেছে, তাকে জোর করে নিয়ে গিয়ে অজ্ঞাত কিছু খাওয়ানোর পর যৌন নিপীড়ন করা হয় এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ করে পরে তা ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা নেয়া হয়েছে।
তবে মঙ্গলবার রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়নি বলে জানিয়েছে ফেনী মডেল থানা।
ভুক্তভোগী কিশোরীর অভিযোগ, পরে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে কায়েফ নামে এক কিশোর বিভিন্ন সময় তার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। এ-সংক্রান্ত কিশোরীর বক্তব্যের একটি ভিডিও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
ভিডিওতে কিশোরী দাবি করে, কায়েফরা তাকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার পর অজ্ঞাত কিছু খাওয়ায়। এরপর তার সাথে খারাপ কাজ করা হয় এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে ওই ভিডিও ব্যবহার করে তাকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে বলে অভিযোগ তার।
কিশোরীর পরিচিত তুহিনের সাথে হওয়া একটি কথোপকথনের রেকর্ডও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সেখানে কিশোরীর কাছ থেকে ৩ হাজার ও ৫০০ টাকা নেয়ার দাবি করা হয়েছে। ওই কথোপকথনের আরেকটি অংশে কায়েফের সাথে অন্য একজনের কথাবার্তার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে কায়েফ ওই কিশোরীকে উদ্দেশ করে অশ্লীল মন্তব্য করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
কিশোরীর ভাষ্য, ঘটনার বিষয়টি সে তার পরিচিত তুহিন ও সাইফকে জানায়। তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করলে কায়েফের পরিবারের সদস্যরা তার বাবার কাছে গিয়ে ভিন্নভাবে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেন। এ সময় কিশোরী তার ভিডিও বার্তায় বিএনপির নাম উল্লেখ করে এনাম ও রুমানের নাম বলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মো. এনামুল হক ভূঁইয়া জেলা যুবদলের আহবায়ক কমিটির সদস্য। জিয়াউর রহমান প্রকাশ রুমান কিছুদিন আগে বাতিল হওয়া পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সহ-সভাপতি ছিলেন। এর আগে তিনি একই ওয়ার্ডের যুবলীগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। একাধিক সূত্রের দাবি, রুমান কায়েফের চাচা।
স্থানীয় সূত্রে আরো জানা গেছে, কায়েফ জিএ একাডেমির পেছনে কাপড়ের দোকানদার মো: মহিউদ্দিন সুমনের ছেলে। সে ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে। কায়েফ ও তার পরিবার বনানীপাড়া-বারাহীপুর আলিয়া জামে মসজিদ এলাকার বাসিন্দা বলে স্থানীয়রা জানান।
ভুক্তভোগী কিশোরী তার ভিডিও বার্তায় আরো দাবি করে, তাকে বাসা থেকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং তাকে মিথ্যা দোষ দেয়া হচ্ছে।
সে বলে, ‘আপনাদের কাছে অনুরোধ, আপনারা কঠিন একটা স্টেপ নেন, যাতে সঠিক বিচার হয়। যাতে সত্যটা থাকে, মিথ্যা দিয়ে এগুলা না করা হয়।’
কিশোরীর দাবি, কায়েফরা তাকে জোর করে নিয়ে গিয়ে অজ্ঞাত কিছু খাওয়ানোর পর তার সাথে খারাপ কাজ করে। পরে সেই ঘটনার ভিডিও করে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে তার কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়। তুহিন ও সাইফকে বিষয়টি জানানোর পর তারা সহযোগিতার চেষ্টা করলে কায়েফের পরিবারের সদস্যরা তার বাবার সাথে কথা বলেন এবং তাকে ফোন না দেয়ার জন্য চাপ দেন বলেও অভিযোগ করে সে।
ভিডিওটির সূত্র ধরে ভুক্তভোগী কিশোরীর স্বজন, আশপাশের একাধিক দোকানদার ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলা হয়। তবে পরিবারের কেউ ভয়ে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি।
মেয়েটির স্বজনরা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, এনামুল হক ভূঁইয়া ও জিয়াউর রহমান রুমন বিষয়টি সমাধান করেছেন। তারা এখনো বিষয়টি সমাধান করতে চান। পরিবার ও মেয়ের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তারা থানায় যেতে চান না বলেও জানান। থানায় গেলে তাদের সমস্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
এদিকে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে কায়েফের বিষয়ে আরো কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, কায়েফ সম্প্রতি কিশোর গ্যাংয়ের সাথে জড়িত হয়েছে। পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে মেয়ে-সংক্রান্ত একই ধরনের আরেকটি ঘটনার কথাও তারা শুনেছেন বলে জানান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা যুবদলের সদস্য মো: এনামুল হক ভূঁইয়া বলেন, তিনি ঘটনার আগাগোড়া তেমন কিছু জানেন না। তার ভাষ্য, একদিন সন্ধ্যায় ছোট ভাইরা তাকে ফোন করে জানায়, একটি মেয়ের সাথে দুই ছেলের প্রেমসংক্রান্ত সমস্যা হয়েছে এবং তাকে সেখানে যেতে বলা হয়।
এনামুল হক ভূঁইয়া বলেন, তিনি সেখানে যাওয়ার পথে রাত প্রায় ১১টা বেজে যায়। এর মধ্যে কায়েফের অভিভাবক, তার চাচা রুমন ও ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি নূর নবী মিলন মিলে একটি সমাধানে এসেছেন বলে জানতে পারেন। পরে উভয়পক্ষের অনুরোধে তিনি ও নূর নবী মিলন সেখানে যান।
তার দাবি, সেখানে প্রেমের সম্পর্কের কথা বলা হলেও ধর্ষণের কথা কেউ বলেনি। পরে উভয়পক্ষের মধ্যে সমাধান হয় এবং তারা একে অপরের সাথে মিলেও গিয়েছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মঙ্গলবার রাতে ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) সজল কান্তি দাস বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে পুলিশকে অবহিত করা হয়নি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি ও ক্রাইম) মু. সাইফুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের কোনো ভিডিও জেলা পুলিশের নজরে আসেনি। ভিডিও পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।



