বাবা যে আর কোনো দিন ফিরবেন না, তা জানে না আড়াই বছরের ছোট্ট জুই। বাবার অপেক্ষায় হয়তো এখনো সে তাকিয়ে আছে পরিচিত দরজার দিকে। অথচ সেই দরজা দিয়ে আর ফিরবেন না বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্মড কোরের সৈনিক (গানার) তাসনিম রিফাত। পরিবারের কাছে তিনি ফিরেছেন নিথর দেহ হয়ে।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ট্যাংক ফায়ারিং অনুশীলন চলাকালে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত রিফাতকে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বাদ জোহর রাজশাহীর পবা উপজেলার দামকুড়া ইউনিয়নের বিন্দারামপুর গ্রামে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এবং পরিবারের সদস্য ও বিপুলসংখ্যক গ্রামবাসীর অংশগ্রহণে জানাজা শেষে সামরিক মর্যাদায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মায়ের কবরের পাশেই কবরস্থ করা হয় তাকে।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ হেলিকপ্টারে করে রিফাতের লাশ রাজশাহী সেনানিবাসে আনা হয়। পরে সেখান থেকে সড়কপথে লাশ নেয়া হয় তার গ্রামের বাড়ি বিন্দারামপুরে। লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। সকাল থেকেই আত্মীয়স্বজন ও গ্রামের মানুষ বাড়িতে ভিড় করেন। প্রিয়জনকে হারানোর শোকে নির্বাক হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজন ও প্রতিবেশীরাও।
রিফাতের স্ত্রী ও ছোট্ট মেয়েকে ঘিরেই ছিল তার সংসার। কর্মসূত্রে স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সরকারি বাসভবনে বসবাস করতেন তিনি। পরিবারের ধারণা ছিল, প্রতিদিনের মতো দায়িত্ব পালন শেষে আবার ঘরে ফিরবেন রিফাত। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হলো না। ফিরলেন না রিফাত; ফিরল তার নিথর দেহ।
আইএসপিআর সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলন চলছিল। এ সময় একটি ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় আকস্মিক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুই সৈনিক নিহত এবং একজন কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন। আহত কর্মকর্তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেয়া হয়। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
নিহতদের একজন সৈনিক (গানার) ২৮ বছর বয়সী তাসনিম রিফাত। তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ১৫ স্বতন্ত্র সাঁজোয়া স্কোয়াড্রনে কর্মরত ছিলেন।
রিফাতের বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার দামকুড়া ইউনিয়নের বিন্দারামপুর গ্রামে। তার বাবা আসাদুল ইসলাম একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। কয়েক বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান রিফাতের মা। মায়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই কর্মক্ষম ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটিতে নেমে এসেছে আরেক দফা শোকের ছায়া।
ছেলের আকস্মিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না বাবা আসাদুল ইসলাম। তিনি বলেন, গত কোরবানির ছুটিতে রিফাত গ্রামের বাড়িতে এসেছিল। এরপরও নিয়মিত যোগাযোগ হতো। ছেলের এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। তাদের পরিবারের জন্য এটি অপূরণীয় ক্ষতি।
চার ভাইবোনের মধ্যে রিফাত ছিলেন দ্বিতীয়। তার বড় ভাই এ বি মাহমুদ দীপ্ত ও ছোট ভাই শামসাদ আহমেদ বিশাল। পরিবারের সদস্যদের সাথে রিফাতের ছিল নিবিড় সম্পর্ক। তার আকস্মিক মৃত্যুর খবর এখনো স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা।



