সুনামগঞ্জে বছরের প্রথমেই তিন দিনের হালকা ও ভারি বৃষ্টি এবং শিলাবৃষ্টিতে বিভিন্ন হাওরের নিচু জমিতে কিছু বোরো ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টিতে হাওরের ফসল রক্ষা কিছু বাঁধেও ফাটল ধরেছে। এ কারণে কৃষকরা চরম শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
বছরে একটিমাত্র ফসলকে ঘিরেই হাওরবাসীর যত স্বপ্ন। সুনামগঞ্জের এই বোরো ধান ঠিকমতো ঘরে উঠলে দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুনামগঞ্জে চলতি বোরো মৌসুমে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় চার শ’ হেক্টর জমি শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার সর্ববৃহৎ বোরো ধানের ভাণ্ডারখ্যাত পাকনা হাওর, ও হালির হাওর, তাহিরপুরে শনির হাওর, ধর্মপাশা উপজেলার ধারাম ও ধানকুনিয়া হাওর, সদর উপজেলার জোয়ারভাঙা হাওর ও কানলার হাওর, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওর, শান্তিগঞ্জ উপজেলার খাই হাওর ও পাখিমারা হাওর, শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরসহ অন্যান্য হাওরে কিছু জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
জেলা ও উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, শিলাবৃষ্টিতে কিছু বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। ধানগাছের থোড়ে পড়ে কিছু থেঁতলে গেছে এবং জলাবদ্ধতায় কিছু জমির থোড় পর্যন্ত পানি জমে আছে।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) দুপুরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃষ্টির পানিতে এখনো জলাবদ্ধতায় ধানের থোড় পর্যন্ত পানি লেগে আছে। এতে বোরো ফসলে কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। হাওর থেকে নদীর পানির উচ্চতা কিছু বেশি থাকায় পানি নিষ্কাশনেরও ব্যবস্থা হচ্ছে না। এতে জলাবদ্ধতায় ধানের তোড়ের ক্ষতি হচ্ছে।
জামালগঞ্জের পাকনা হওরের ফেনারবাঁকের শান্তিপুর গ্রামের কৃষক হাজী এনায়েত কবির খাঁন জানান, তার প্রায় ১২-১৩ কেদার জমির ধানের চারার বেশির ভাগ অংশই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সবগুলোতে তোড় হয়েছিল। এখনো জলমগ্ন আছে। এই জমিতেই তার সংসার চলা, সারা বছরের খরচের উৎস ছিল এই জমির ফসল। তিনি এখন হাহুতাশ করছেন। তার মতো গ্রামের অনেক কৃষকের একই অবস্থা।
জামালগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জুলফিকার চৌধুরী রানা বলেন, ‘আমি পাকনা হাওরে ধান রোপন করা থেকেই কৃষক ভাইদের সাথে থেকে গ্রামবাসীকে নিয়ে পানি নিষ্কাশনের কাজ করেছি। এখন বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত জমি ঘুরে দেখেছি। বহু কৃষকের বোরো ধানক্ষেত পানিতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষকের এই ক্ষতিপূরণ করা কঠিন।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন। তিনি জানিয়েছেন ভবিষ্যতে এই জলাবদ্ধতা কিভাবে নিরসন করা যায় এলাকার কৃষকদের সাথে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নেবেন।’
‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, ‘হাওরে বাঁধের কাজ ঠিকমতো হয়নি। বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা ফোন করে জানাচ্ছেন বৃষ্টিতে বাঁধে ফাটল ধরেছে। বিভিন্ন হাওরের ধানী জমিগুলো পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, কৃষকরা দুঃচিন্তায় ভুগছেন। বাঁধের কাজ ভালো হয়নি। বোরো ফসলের কোনো ক্ষতি হলে প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) এর দায় নিতে হবে।’
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বিভিন্ন হাওর পরিদর্শন করে ফেসবুকে পোস্ট করে জানান দিচ্ছেন। তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের মনগড়া হাওরের বাঁধের কাজ করছে। নির্ধারিত সময়েও তারা বাঁধের কাজ শেষ করতে পারেনি। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় অনেক হাওরে ধানক্ষেত জলাবদ্ধতার ঢেকে আছে। জেলার প্রায় সব উপজেলাতেই শিলাবৃষ্টি হয়েছে। তোড় আসা ধানের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, জলাবদ্ধতা জমিগুলো থেকে পানি নিষ্কাশনের সুযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য মতে জানা যায়, এবার সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সংস্কার ও নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে সুনামগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মামুন হাওলাদারের মোবাইলফোনে কল দিলে তিনি জানান, বৃষ্টির পূর্বাভাস আরো এক সপ্তাহে আছে। বৃষ্টি হলেও তেমন ভারি বৃষ্টি হবে না। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলো পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করছি। যেখানে সমস্যা পাচ্ছি, সেখানে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আশা করি এই মুহূর্তে বাঁধের কোনো সমস্যা হবে না।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বিভিন্ন হাওর ও টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে দেখেছেন। তিনি হাওরের বাঁধ মনিটরিং ও জলাবদ্ধতা নিরসনে পাউবোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।



