টোল রাজস্বে গতি আনছে দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রমত্তা পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত পদ্মাসেতু। আর এ থেকে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যুক্ত করছে নতুন মাত্রা। পদ্মার বুক মাড়িয়ে চলতে থাকা যানবাহনগুলো থেকে দিন দিন যেনো বেড়েই চলেছে পদ্মা সেতুর টোল আয়।সেতু দিয়ে দূরপাল্লার যানবাহনগুলো চলাচল করছে নির্বিঘ্নে।
সময় ব্যবধানে অত্যাধুনিক ও নতুন করে যুক্ত হওয়া ক্যাশলেস ‘ডি’টোল সুবিধাসহ সেতু কর্তৃপক্ষের আগেভাগেই ব্যাপক প্রস্তুতি ও সেতুর উভয়প্রান্তে মোট ১৯টি টোলবুথ সার্বক্ষণিক সচল থাকায় নির্বিঘ্নে এবং স্বস্তিতেই যাত্রীসাধারণ সেতু পাড়ি দিচ্ছেন।
মঙ্গলবার (২৬ মে) সর্বোচ্চ নতুন রেকর্ড গড়ল সেতু থেকে টোল আদায়ের পরিমাণ। এখন অবধি এটি সেতুর ইতিহাসে টোল আদায়ের সর্বোচ্চ নতুন ২য় রেকর্ড।
এর আগের দিনও পদ্মাসেতুতে টোল আদায়ে সর্বোচ্চ চতুর্থ রেকর্ড গড়েছিলো। তবে এ রেকর্ডটি আজ সর্বোচ্চ পঞ্চম রেকর্ডে নেমে এসেছে।
বুধবার (২৭মে) বেলা সাড়ে ১১টায় সেতু কর্তৃপক্ষের পদ্মাসেতুর সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় নয়া দিগন্তকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের টোল রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, সেতু চালুর পর থেকে গেলো বছরের ঈদুল আজহায় সেতুর টোল আদায়ে ১ম রেকর্ড গড়ে । গেলো ঈদুল আজহায় ৫ জুন ছিল সেতুর টোল আদায়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১ম রেকর্ড। ঈদের আগ মুহূর্তে এদিন ২৪ ঘণ্টায় পদ্মাসেতুতে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত দিয়ে গাড়ি পারাপারের সংখ্যা ছিলো ৫২ হাজার ৪৮৭টি। যা পদ্মাসেতুর ইতিহাসে সর্বোচ্চ যানবাহন পারাপার। এতে ঐদিন টোল রাজস্বে আয় হয়েছে পাঁচ কোটি ৪৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা।যা পদ্মাসেতুর টোল আদায়ে এটি এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি।
এরপর চলতি ঈদুল আজহা পূর্ব গতকাল মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত দিয়ে মোট ৪৫হাজার ৬০২টি যানবাহন পারাপার করা হয়। এতে মোট টোল আদায় হয়েছে পাঁচ কোটি তিন লাখ ২৪ হাজার ৪৫০টাকা। এটি সেতুর চালুর পর থেকে টোল আদায়ে সর্বোচ্চ ২য় রেকর্ড গড়েছে। এদিন শুধু মাওয়া প্রান্ত দিয়ে ৩০ হাজারের বেশি যানবাহন সেতু পাড়ি দেয়। এতে টোল আদায় প্রায় তিন কোটির কাছাকাছি ছুঁই ছুঁই করছিল।
এর আগে ২০২২ সালের ২৬ জুন সেতু চালু হওয়ার পর একদিনে সর্বোচ্চ টোল আদায়ের রেকর্ড হয়েছিল ২০২৪ সালের ৯ এপ্রিল। ওই দিন মোট ৪৫ হাজার ২০৪টি যানবাহন থেকে চার কোটি ৮৯ লাখ ৯৪ হাজার ৭০০ টাকা টোল আদায় হয়েছিল। এটি সে সময় ২য় সর্বোচ্চ টোল আদায়ের রেকর্ড গড়লেও গতকাল থেকে এ রেকর্ডটি তৃতীয় অবস্থানে নেমে এসেছে।
একই বছরের ১৪ জুন সর্বোচ্চ টোল আদায়ের রেকর্ড গড়ে।এদিন ৪৪ হাজার ৩৩টি যানবাহন থেকে টোল আদায় হয়েছে চার কোটি ৮০ লাখ ৩০ হাজার ১০০ টাকা।
এরপর চলতি ঈদুল আজহায় গত সোমবার ২৪ ঘণ্টায় মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত দিয়ে মোট ৪৪ হাজার আটটি যানবাহন পারাপার করা হয়। এতে মোট টোল আদায় হয়েছে চার কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৩৫০টাকা। এটি সেতুর চালুর পর থেকে টোল আদায়ে সর্বোচ্চ আরেকটি রেকর্ড গড়ে।
অন্যদিকে ২০২৩ সালের ২৭ জুন সেতু দিয়ে ৪৩ হাজার ১৩৭টি যানবাহন পারাপার হয়েছিল। এদিন টোল আদায় হয়েছিল চার কোটি ৬০ লাখ ৫৩ হাজার ৩০০ টাকা।
একইসাথে গেলো ঈদুল আজহার ৬ জুন ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা সেতুতে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত দিয়ে পারাপারের গাড়ির সংখ্যা ছিলো ৪০ হাজার ১১৮টি। এদিন টোল রাজস্বে আয় হয় চার কোটি ৪৭ লক্ষ ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা।
পদ্মাসেতুর সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় নয়া দিগন্তকে জানান, ছুটির তৃতীয় দিনেও ঈদের আগমুহূর্তে মাওয়া প্রান্তের টোল প্লাজা হয়ে যানবাহনের চাপ রয়েছে। তবে নির্বিঘ্নে এবং স্বস্তিতেই ঘরমুখো যাত্রীসাধারণ সেতু পাড়ি দিচ্ছে। টোলপ্লাজায় কোনো প্রকার জট নেই।
উল্লেখ্য,২০২২ সালের ২৫ জুন প্রমত্তা পদ্মা নদীর বুকে চালু হয় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দেশের বৃহত্তম পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পটি। প্রকল্পের সর্বশেষ প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ব্যয় সঙ্কোচননীতি অবলম্বন করে সর্বশেষ চূড়ান্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে প্রায় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। বাকি ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দিয়েছে অর্থ বিভাগ।
ঋণ চুক্তি অনুযায়ী ১ শতাংশ সুদসহ ৩৫বছরে ঋণের টাকা ফেরত দেবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। ঋণ পরিশোধের শিডিউল অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরে চারটি কিস্তি করে সর্বমোট ১৪০টি কিস্তিতে সুদ-আসল পরিশোধ করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে সেতুটির ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে এবং এ ঋণ পরিশোধের জন্য ২০৫৬-৫৭ অর্থবছর পর্যন্ত সময় পাবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।



