রংপুর কারাগারে বিদ্রোহের নেপথ্যে প্রধান কারারক্ষী ছামিউল? তদন্তে মিলছে নানা তথ্য

তার বিরুদ্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং জুলাই আন্দোলনের সময় বন্দী বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়াসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর তথ্য পাচার, মাদকাসক্ত কারাবন্দীদের মধ্যে মাদক সাপ্লাই, স্বচ্ছল কারাবন্দীদের সাথে টাকার বিনিময়ে মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রদানের তথ্য গোয়েন্দাদের হাতে

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো

Location :

Rangpur
রংপুর কারাগারে সাবেক প্রধান কারারক্ষী ছামিউল
রংপুর কারাগারে সাবেক প্রধান কারারক্ষী ছামিউল |নয়া দিগন্ত

রংপুর কারাগারের সদ্য সাবেক প্রধান কারারক্ষী ছামিউল ইসলামের শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরির মাধ্যমে কারাগারে রাজত্ব তৈরির তথ্য এখন কেন্দ্রীয় প্রিজন্স কর্মকর্তাদের কাছে।

তার বিরুদ্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং জুলাই আন্দোলনের সময় বন্দী বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়াসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর তথ্য পাচার, মাদকাসক্ত কারাবন্দীদের মধ্যে মাদক সাপ্লাই, স্বচ্ছল কারাবন্দীদের সাথে টাকার বিনিময়ে মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রদানের তথ্য গোয়েন্দাদের হাতে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের কারাগারে জামাই আদর ও মাঠে আন্দোলনের পরিকল্পনার তথ্য আদান-প্রদান, একাধিক মুহুরির মাধ্যমে জামিন বাণিজ্যের লেনদেনের তথ্যও কেন্দ্রীয় কারাকর্তৃপক্ষের হাতে। আছে কারা পুলিশ নিয়োগে সিন্ডিকেটভিত্তিক বাণিজ্যেরও অভিযোগ।

মব তৈরি করে ডিউটি ফাঁকি দিয়ে কারাকর্মকর্তাদের জিম্মি করারও তথ্য আছে গোয়েন্দাদের কাছে। ২৪ বছরের চাকরি জীবনে নানা অভিযোগে ২ দফায় প্রশাসনিক বদলি, ৩ বার সাময়িক বরখাস্ত এবং ৫ দফায় সতর্ক নোটিশ পেয়েও বিগত সরকারের আমলে বাগিয়ে নিয়েছেন প্রধান কারারক্ষীর পদ। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে তাকে রংপুর কারাগার থেকে বদলি করা হয়েছে পঞ্চগড় কারাগারে। কারারক্ষী ছামিউল ইসলামের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তদন্ত করছে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

তদন্তের সাথে যুক্ত একাধিক সূত্র এবং কারাসূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালে বগুড়া কারাগারে কারারক্ষী হিসেবে নিয়োগ পান গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছয়ঘরিয়া এলাকার মহির উদ্দিনের পুত্র ছামিউল ইসলাম। ১৯৯৯ সালে বৈদ্যনাথ আদর্শ দাখিল মাদরাসা থেকে দাখিল (এসএসসি) পাস করার পর ওই পদে যোগ দেন তিনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যুক্ত হন শক্তিশালী কারারক্ষী চক্রে। আওয়ামী লীগের একান্ত অনুগত হয়ে প্রচণ্ড প্রভাববলয় তৈরি করে সিনিয়রদের ডিঙিয়ে ২০১১ সালের ২৩ এপ্রিল বাগিয়ে নেন প্রধান কারারক্ষীর পদ। হয়ে ওঠেন কারাগারের একচ্ছত্র রাজা। চাকরি জীবনে বগুড়া ছাড়াও রাজশাহী, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী হয়ে সব শেষে ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর যোগ দেন রংপুরে। রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান কারারক্ষী হিসেবে যোগ দিয়েই অলিখিত রাজা বনে যান ছামিউল ইসলাম।

বিএনপি-জামায়াত বন্দীদের ওপর মানসিক নির্যাতন: তদন্তে যুক্ত একাধিক সূত্র জানায়, জুলাই আন্দোলনের আগে কারাগারে যাওয়া তৎকালীন সরকারবিরোধী আন্দোলনে থাকা বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে উঠেন ছামিউল। পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে বাড়তি মাসোহারা না দিলে বিভিন্ন ধরনের মানসিক নির্যাতন নামত রাজবন্দীদের ওপর। টাকা না পেলেই রাজবন্দীদের কারাগারে নানাধরনের নিয়মের বেড়াজালে ফেলা হতো। চলত মানসিক টর্চারিং। এ ধরনের অন্তত ১৫ জন রাজবন্দীর সাথে কথা বলেছে প্রতিবেদক। তারা নাম প্রকাশ না করে বর্ণনা করেছেন সেসব কথা। তার নেতৃত্বে একটি কারারক্ষী সিন্ডিকেট ছিল জেলখানায় সরব। টাকা না দিলেই নেমে আসত মানসিক টর্চার। অনেকের গায়ে হাত তুলতেন ছামিউল ও তার সিন্ডিকেট। জুলাই আন্দোলনের সময় ছামিউল সিন্ডিকেট আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ওই সময় ছামিউল ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কারাগারে থাকা শত শত বিএনপি-জামায়াত এবং আন্দোলনে অংশ নেয়া কারাবন্দীদের অমানুষিক নির্যাতন করে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও তদন্ত করছে গোয়েন্দারা।

স্পর্শকাতর তথ্য পাচার: কারা সূত্র এবং গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, জুলাই বিপ্লবের আগে কারাগারের বিভিন্ন স্পর্শকাতর নথিপত্র এবং সরকারি সিদ্ধান্তও ছামিউলের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে যেত। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে, সেসব বিষয় ছামিউলের মাধ্যমে বাইরে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে যেত। আওয়ামী লীগের নেতারা তখন বিএনপি-জামায়াতের সেসব বন্দীদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ছামিউলের মাধ্যমে সুরাহা করতেন।

বিদ্রোহ ও মব তৈরিতে লিড দেয়া: তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চলতি বছরের ঈদুল আজহার সময় ছুটি-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে একটি বিরাট মব তৈরির চেষ্টা করেন ছামিউল। ১০ মিনিটের মধ্যেই অন্তত ২৪/২৫ জন কারারক্ষীকে ফটকের সামনে এনে সিনিয়র জেল সুপার ও জেলারের বিরুদ্ধে মব তৈরির চেষ্টা করেন। বিষয়টি কারা গোয়েন্দা ও সিসিটিভি ফুটেজে টের পেয়ে কারাকর্তৃপক্ষ কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করেন।

তদন্তসূত্রগুলো আরো জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রংপুর কারাগারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতারা একটি বিদ্রোহ তৈরির চেষ্টা করে। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন হবে না বলে পুরো জেলখানায় একটি প্রচারণা চালিয়ে বন্দীদের সংঘবদ্ধ করার চেষ্টা করে। পুরো ঘটনাটিকে সফল করতে প্রধান কারারক্ষী হিসেবে ছামিউল ইসলাম প্রকাশ্যে ও নেপথ্যে থেকে লিড দেয় বলে কারাকর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট হয়। তখন কড়া নজরদারি বাড়িয়ে কারাকর্তৃপক্ষের সেই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার তথ্য খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দারা।

তদন্তে যুক্ত থাকা সূত্রগুলো আরো জানান, জুলাই বিপ্লবের সময় রংপুর কারাগারে যে বিদ্রোহ করেছিলেন বন্দীরা, তাতেও সরাসরি যুক্ত ছিল ছামিউল ইসলাম। ছামিউলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মাধ্যমে বন্দীদের কারাগার থেকে বের করে দিতে আর্থিক লেনদেন করারও তথ্য আছে গোয়েন্দাদের হাতে। ফলে দফায় দফায় তার কারণে কারাগারের নিরাপত্তার বিষয়টি হুমকির মুখে পড়ে। এ নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয় খোদ কারাকর্তৃপক্ষের মধ্যে।

জামিন বাণিজ্য: তদন্তে যুক্ত একাধিক সূত্র জানায়, প্রধান কারারক্ষী হিসেবে ছামিউলের কোর্ট চত্বরে একাধিক মুহুরির সাথে ছিল জামিন সিন্ডিকেট। তারা ছামিউলকে তথ্য দিতেন কখন কার জামিন হবে। তখন ছামিউল সেই বন্দীর কাছে গিয়ে রফাদফা করতেন। চুক্তির অর্ধেক টাকা নেয়া হতো জামিন হওয়ার আগে। আর বাকি টাকা নেয়া হতো জামিনের পরে কারাগার থেকে বের হওয়ার আগে। ২৪-এর জুলাই বিপ্লবের পর ছামিউল ও তার সিন্ডিকেট এই জামিন বাণিজ্য করে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। এর সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা বলে জানিয়েছে তদন্ত সূত্র।

তদন্তে যুক্ত সূত্রগুলো জানায়, কোর্ট এলাকার মুহুরি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে ছামিউল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে গিয়ে জানাতো, বিশেষভাবে বের না করলে জেলগেট থেকে আবার গ্রেফতার করবে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে বন্দীদের পরিবারের সাথে সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত চুক্তি করত সে। যারা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানাত, তাদের তথ্য সে সবার আগে পৌঁছে দিত ডিবিসহ পুলিশের কাছে। তাদেরকে আবার গ্রেফতার করা হতো জেলগেটে। অনেকেই এই সুবিধা পেয়ে গ্রেফতার এড়াতে পেরেছেন। এ ধরনের কয়েকজনের সাথে কথা বলেছে প্রতিবেদক। তারা ছামিউলের সাথে লেনদেন করে গ্রেফতার এড়িয়ে জেলগেট থেকে বের হয়েছেন স্বীকার করলেও নাম প্রকাশ করতে চাননি তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে।

স্বচ্ছল বন্দীদের মোবাইল সুবিধা: ছামিউল ও তার সিন্ডিকেট কারাগারে স্বচ্ছল বন্দীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। এজন্য স্বচ্ছল বন্দীদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের পরিবারের কাছে যেতেন। তাদের কাছ থেকে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে স্বচ্ছল বন্দীদের বিশেষ সুবিধা দিতেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল একাধিকবার মোবাইল ফোনে কথা বলিয়ে দেয়া। টাকার বিনিময়ে ছামিউল সেটা করত অনেকটা প্রকাশ্যে। এ ছাড়া ছামিউল তার বিকাশে টাকা নিতেন বন্দীদের জন্য। প্রতি ১০০ টাকায় ১০ টাকা করে কেটে নিতেন তিনি। ছামিউলের নেতৃত্বে টাকার বিনিময়ে কারাগারে এবং কারাগারের বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে বন্দীদের চিকিৎসা করানোর একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল, সেই তথ্যও গোয়েন্দাদের হাতে।

মাদক সাপ্লাই: তদন্তে যুক্ত সূত্রগুলো জানায়, কারাগারে থাকা মেরিল সুমন, খাপড়ি পলাশ, পিচ্চি আপেল, কটকি মিরু, মজনু মিয়া, রাজুসহ বেশ কিছু প্রভাবশালী মাদকাসক্ত বন্দী রয়েছে। তাদেরকে সরাসরি মাদক সাপ্লাই দিত ছামিউল। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই কাজটা করত ছামিউল ও তার সিন্ডিকেট। ছামিউল যেহেতু প্রধান কারারক্ষী এবং তার শক্ত সিন্ডিকেট আছে, সে কারণে অপেক্ষাকৃত কম পদবির কারারক্ষীরা যেহেতু গেটের দায়িত্বে থাকে, সে কারণে ছামিউলকে চেক করতে পারত না তারা। সেই সুবাদে মাদক সাপ্লাই করত কারাবন্দীদের। যা খুবই স্পর্শকাতর বলে জানিয়েছে তদন্তসূত্রগুলো।

তদন্ত সূত্রগুলো জানায়, কারারক্ষীদের সাথে দুর্ব্যবহার ও হুমকি দেয়ার কারণে গত ১৮ জুন রংপুর কারাগারে বন্দী মাদক ও অস্ত্র মামলার হাজতি আল শাহরিয়ার ওরফে সাহস ও আজমাইন ইনকিদার ওরফে স্বর্ণকে পঞ্চগড় এবং রহিদুল ইসলাম রোলেক্স ও আল শাফায়েত হোসেন শামীমকে দিনাজপুর কারাগারে বদলি করা হয়।

তদন্ত সূত্রগুলো জানায়, মূলত তাদের এবং তাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় তাদেরকে মাদক, মোবাইল ফোন সার্ভিসসহ বিভিন্ন সুবিধা দিত প্রধান কারারক্ষী ছামিউল। বিষয়গুলো অন্য কারারক্ষীরা কর্তৃপক্ষকে জানালে সেটি মেনে নিতে পারেননি ছামিউল। সে কারণে এসব হাজতিদের দিয়ে কারারক্ষীদের জীবননাশের হুমকি দেয়ায় ছামিউল।

কারারক্ষী নিয়োগে বাণিজ্য: ছামিউলের বিরুদ্ধে কারা পুলিশ নিয়োগেও আছে সিন্ডিকেটভিত্তিক বাণিজ্যের অভিযোগ। তার নির্ধারিত এজেন্টরা চুক্তি করতেন টাকার। ৮ থেকে ১২ লাখ টাকায় হতো চুক্তি। এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনার তথ্য আছে প্রতিবেদকের হাতে। একজন কারারক্ষী নিয়োগের মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে ৯ লাখ টাকা ছামিউলকে দিয়েছিলেন রংপুর সদর উপজেলার একটি ইউনিয়নের একজন প্রভাবশালী মহিলা ইউপি সদস্য। ওই ইউপি সদস্য তৎকালীন সময়ে সদর উপজেলার যুব মহিলা লীগের নেত্রী ছিলেন। কিন্তু কারারক্ষী নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ছামিউল টাকা ফেরত দিতে গড়িমসি করেন। ফলে যার মাধ্যমে ওই ইউপি সদস্য টাকা দিয়েছিলেন, তিনি পরে যান বিপাকে। এ নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়। পরে ৭০ ভাগ টাকা ফেরত দিলেও বাকি টাকা এখনও ফেরত দেননি বলে জানা গেছে। এই বিষয়টিসহ নিয়োগ বাণিজ্যের তথ্যগুলোও তদন্ত করছে সংশ্লিষ্টরা।

আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ম্যাসেঞ্জার: তদন্তে যুক্ত একাধিক সূত্র জানায়, জুলাই বিপ্লবের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের যতগুলো নেতাকর্মী কারাগারে গেছেন, ছামিউলের বিশেষ যত্ন-আত্তিতে তারা জামাই আদরে আছেন। অনুসন্ধান বলছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগের রংপুর মহানগর সভাপতি তুষারকান্তি মণ্ডল, স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহানগর সভাপতি সিরাজুম মুনির বাশার ছামিউলের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। তার মাধ্যমেই বিভিন্ন সাংগঠনিক নির্দেশনা দিতেন।

তদন্ত সূত্রগুলো জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে রংপুরে আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের যেসব ফেসবুক অ্যাক্টিভিটি এবং মিছিলের ছবি ভাইরাল হয়েছে, তাতে নির্দেশনা দিয়েছেন তুষারকান্তি মণ্ডল ও সিরাজুম মুনির বাশার। কারাগার থেকে সেটাও ছামিউলের মাধ্যমেই গেছে নেতাকর্মীদের কাছে। কোথায়, কীভাবে, কখন মিছিল করতে হবে, সেটার রুট নির্দেশনা ছামিউলের মাধ্যমেই দিতেন তারা। রংপুর সমবায় ব্যাংক ও বিল্ডিং নিয়ে যে অস্থিরতা চলছে, সেটাও ছামিউলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতেন তুষারকান্তি মণ্ডল। আওয়ামীলীগ নেতাদের ব্যবসায়িক অনেক সিদ্ধান্তও ছামিউলের মাধ্যমে পরিবারের কাছে যেত। ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের নথিপত্র আদান-প্রদান হতো ছামিউলের মাধ্যমে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কারাগারের শৃঙ্খলা, গোপনীয়তা রক্ষা এবং স্পর্শকাতর বিষয়সহ সুষ্ঠু কারা প্রশাসন পরিচালনার স্বার্থে ছামিউল ইসলামকে প্রশাসনিক কারণে বদলির জন্য রংপুর বিভাগীয় কারা উপ-মহাপরিদর্শক কামাল হোসেনের কাছে গত ১৮ জুন লিখিত আবেদন করেন (স্মারক নং-৪৪.০৭.৮৫০০.১৬২.০৩.০০১.২০২৬-২৫৯৪) রংপুর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার এএসএম কামরুল হুদা। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘প্রধান কারারক্ষী ছামিউল ইসলাম প্রায় সময় কারা প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে লিপ্ত থাকেন। বিভিন্ন সময় গার্ডিং স্টাফদের নিয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের উস্কানিমূলক নানাবিধ কার্যকলাপে জড়িত থাকেন। ১৮ জুন আরপি গেট এলাকায় জনৈক এক ব্যক্তির সাথে মোবাইল ফোন নিয়ে কারা এলাকায় প্রবেশকালে বহিরাগত কিছু লোকের সাথে কারা প্রশাসনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। যার নেপথ্যে প্রধান কারারক্ষী ছামিউলের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়।

চিঠিতে সিনিয়র জেল সুপার আরো লেখেন, ‘এমতাবস্থায় কেন্দ্রীয় কারাগারের সুষ্ঠু কারা প্রশাসন পরিচালনার স্বার্থে তাকে অনতিবিলম্বে অত্র বিভাগের দূরবর্তী কোনো কারাগারে বদলি করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হলো।’

এই আবেদনের প্রেক্ষিতে দাপ্তরিক প্রক্রিয়ায় রংপুর বিভাগীয় কারা উপ-মহাপরিদর্শক ছামিউলকে পঞ্চগড় কারাগারে বদলির আদেশ দেন (স্মারক নং-৫৮.০৪.৮৫০০.০৬৫.০৩.০৮২.২৬-১৬৫৭/৫)। এছাড়াও কারা মহাপরিদর্শকের কাছে গত ২৭ জুন ছামিউলের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লিখিতভাবে জানান (স্মারক নং-৫৮.০৪.৮৫০০.০৬৫.০৩.০৮২.২০২৬-১৭০৪/২) রংপুর বিভাগীয় কারা উপ-মহাপরিদর্শক। তদন্ত সূত্রগুলো জানায়, বিভাগীয় মামলার বিষয়টি এখন প্রক্রিয়াধীন।

শুধু এবারই নয়, তার বিরুদ্ধে এর আগেও বিভাগীয় মামলা, সাময়িক বরখাস্ত এবং সতর্ক করার তথ্যও পেয়েছে তদন্ত সংস্থাগুলো।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বগুড়া কারাগারে যোগ দিয়েই ডিউটি না করা, বিধি ভেঙে বন্দীদের সাথে বিশেষ সখ্যতা তৈরি, গল্পগুজব এবং বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন ছামিউল। চাকরি জীবনের দ্বিতীয় বছর ২০০৩ সালে কর্তব্য অবহেলার কারণে বগুড়া কারাকর্তৃপক্ষ তাকে সতর্ক নোটিশ দেয়। পরে তাকে বদলি করা হয় রাজশাহী কারাগারে। ২০০৬ সালে কর্তব্য অবহেলার কারণে আবারও তাকে সতর্কতামূলক নোটিশ দেয় রাজশাহী কারাকর্তৃপক্ষ। ২০০৭ সালে রাজশাহী কারাগারে চাকরিরত অবস্থায় বন্দীদের সাথে বিশেষ সখ্যতা গড়ে তোলাসহ বিভিন্ন অপরাধ এবং কর্তব্য অবহেলার কারণে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। ২০০৮ সালে রাজশাহী কারাগারে একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রীর সাথে অসদাচরণ ও চাকরিবিধি বহির্ভূত আচরণের কারণে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে রাজশাহী কারাকর্তৃপক্ষ। কিন্তু প্রভাব গড়ে তুলে ২০০৯ সালে চাকরিতে পুনর্বহাল হন ছামিউল। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে তাকে বদলি করা হয় লালমনিরহাট কারাগারে। সেখানে ২০১৪ সালে আবারও কর্তব্য অবহেলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে সতর্কতামূলক নোটিশ দেয় কর্তৃপক্ষ। ২০১৪ সালের ২৮ মে গুরুত্বপূর্ণ অপরাধের কারণে তাকে প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে লালমনিরহাট থেকে বদলি করা হয় রংপুর কারাগারে। রংপুরে এসে আবারও কর্তব্যকাজে অবহেলা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলে তাকে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে বদলি করা হয় দিনাজপুর কারাগারে। সেখানেও কর্তব্য অবহেলা এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ছামিউলকে ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে বদলি করা হয় নীলফামারী কারাগারে। আবারও কর্তব্য অবহেলার কারণে সেখান থেকে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বদলি করা হয় পঞ্চগড় কারাগারে। ২০১৯ সালে পঞ্চগড় কারাগারে একজন বন্দী আত্মহত্যা করলে তাকে কর্তব্য অবহেলার কারণে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। করা হয় বিভাগীয় মামলা। আবারও বিশেষ ম্যানেজ মিশনে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পঞ্চগড় কারাগারে পুনর্বহাল হন। এরপর ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে বদলি হয়ে আসেন কুড়িগ্রাম কারাগারে। সেখান থেকে রংপুর কারাগারে বদলি হয়ে আসেন ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে।

ছামিউলের বিষয়ে জানতে জেল সুপার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সাথে কথা বলেন প্রতিবেদক। তিনি জানান, ‘ছামিউল ইসলামের বিরুদ্ধে কারাগারের গোপনীয়তা পাচার করা, মাদকাসক্ত বন্দীদের কাছে মাদক সরবরাহ, স্বচ্ছল বন্দীদের সাথে সখ্যতা স্থাপন করে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা দেয়া-নেয়া, ডিউটি পালন না করা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে সখ্যতা স্থাপন, মব তৈরি করে কর্মকর্তাদের জিম্মি করাসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ আছে। সুষ্ঠুভাবে কারা প্রশাসন পরিচালনার স্বার্থে তাকে বদলির জন্য ডিআইজি প্রিজনের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করেছেন সিনিয়র জেল সুপার স্যার।’

এ বিষয়ে সিনিয়র জেল সুপার এএসএম কামরুল হুদা জানান, ‘প্রধান কারারক্ষী ছামিউলের বিরুদ্ধে কারা প্রশাসন, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, গোপনীয়তা, স্পর্শকাতর বিষয়সহ বিভিন্ন নেতিবাচক বিষয় ছিল। সেসব বিষয়ের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে রংপুর কারাগারের সুষ্ঠু পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যত্যয় তৈরি হয়। সে কারণে আমরা তাকে প্রশাসনিক কারণে অন্যত্র বদলির জন্য আবেদন করি এবং ডিআইজি স্যার সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছেন।’

এ ব্যাপারে রংপুর বিভাগীয় কারা উপ-মহাপরিদর্শক কামাল হোসেন বলেন, ‘প্রধান কারারক্ষী ছামিউলের বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লবের সময় কারা বিদ্রোহ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কারা বিদ্রোহসহ প্রশাসনিক কাজে মব তৈরি করার বিভিন্ন সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়াও বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়গুলোর কারণে সুষ্ঠুভাবে কারা প্রশাসন পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিল না। সে কারণে তাকে প্রশাসনিক বদলির জন্য আমাকে চিঠি দেয়া হয়। আমি বিষয়টি তদন্ত করে তাকে দাপ্তরিক কাজের অংশ হিসেবে পঞ্চগড়ে বদলি করেছি। এছাড়াও তদন্তের স্বার্থে তার দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করা আছে। সেগুলো সংশ্লিষ্টরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কারা মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে।’

ফোন জব্দ থাকায় পঞ্চগড় কারাগারে বদলি হওয়া ছামিউল ইসলামের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা।