রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বৈরাগীর খাল পুনঃখনন কাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া খালটি পুনঃখননের ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সে লক্ষে বৃহস্পতিবার (৭ মে) সকাল ১০টার দিকে রাজশাহী-৩ আসনের এমপি শফিকুল হক মিলন ফলক উন্মোচন ও মাটি কাটার মধ্য দিয়ে পারিলা ইউনিয়নের বৈরাগীর খালের পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে প্রতীকীভাবে ডালিতে মাটি পরিবহন করেন পবা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী হোসেন, সদস্য সচিব আব্দুর রাজ্জাক ও যুগ্ম আহ্বায়ক সুলতান আহমেদ।
এসময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, কৃষক ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০২৫-৩০ অর্থবছরের মেয়াদে দেশের ৬৪টি জেলায় প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, পুনঃখনন ও সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খননযোগ্য খালের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেই কর্মসূচির আওতায় পবা উপজেলার বৈরাগীর খালের তিন কিলোমিটার অংশ পুনঃখনন করা হচ্ছে।
পবা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বৈরাগীর খালের জলিলের ভাটা থেকে ফলিয়ার বিল পর্যন্ত তিন কিলোমিটার খাল পুনঃখনন কাজের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ কোটি ২৯ লাখ ৫৯ হাজার ৭৭৬ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে খালের পানি ফলিয়ার বিল হয়ে দুর্গাপুর উপজেলার প্রধান নদী হোজা নদীতে গিয়ে মিলিত হবে। ফলে কৃষিজমিতে পানি নিষ্কাশন সহজ হবে এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাবে।
স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, এই পুনঃখনন কার্যক্রমের সুফল পাবেন প্রায় ২০ হাজার পরিবার।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুল হক মিলন এমপি বলেন, ‘খাল পুনঃখনন শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি কৃষক, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা সেচ সঙ্কট, জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশনের সমস্যায় ভুগছেন। বৈরাগীর খাল পুনঃখনন হলে এই অঞ্চলের কৃষিতে নতুন প্রাণ ফিরে আসবে।
তিনি আরো বলেন, ‘সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। উন্নয়ন যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব সুফল বয়ে আনে সেই লক্ষেই এসব প্রকল্প নেয়া হয়েছে। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাই কৃষির উন্নয়ন ও পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে খাল পুনঃখননের মতো কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
এমপি মিলন বলেন, ‘এই খাল পুনঃখননের মাধ্যমে শুধু সেচ সুবিধা বাড়বে না, বর্ষা মৌসুমে জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশন হবে। এতে ফসলের ক্ষতি কমবে, জমির উর্বরতা রক্ষা পাবে এবং কৃষকরা বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ পাবেন। একই সাথে মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও এই খাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: ইবনুল আবেদীন।
তিনি বলেন, ‘বৈরাগীর খাল এলাকার কৃষি ও জনজীবনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। খালটি পুনঃখনন হলে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হবে, সেচব্যবস্থা উন্নত হবে এবং জলাবদ্ধতা অনেকাংশে দূর হবে। এই কাজের মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত তদারকি করবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, সেটি নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি খাল পুনঃখননের পর তা যেন আবার দখল, ভরাট বা দূষণের শিকার না হয়, সে জন্য স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা জরুরি। খাল রক্ষা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।’
খাল পুনঃখনন কাজ তদারকির জন্য উপজেলা পর্যায়ে একটি তদারকি টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিমের আহ্বায়ক করা হয়েছে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: ইবনুল আবেদীনকে।
সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো: মাহমুদুল ইসলাম।
সদস্য হিসেবে রয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম এ মান্নান, উপজেলা প্রকৌশলী মকবুল হোসেন এবং পারিলা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাঈদ আলী।
স্থানীয় কৃষক কদম আলী বলেন, বৈরাগীর খালটি একসময় এলাকার কৃষির প্রধান পানির উৎস ছিল। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি এই খাল দিয়ে নিষ্কাশন হতো এবং শুষ্ক মৌসুমে খালের পানি ব্যবহার করে কৃষকরা জমিতে সেচ দিতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে বর্ষায় জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ সঙ্কট দেখা দেয়।
আরেক কৃষক মুনতাজ আলী জানান, খালটি পুনঃখনন হলে বোরো, আমন, সবজি ও অন্যান্য ফসল চাষে সুবিধা হবে। আগে যেখানে পানির অভাবে অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকত, সেখানে আবার চাষাবাদের সুযোগ তৈরি হবে। এতে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং আয় বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
পারিলা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাঈদ আলী বলেন, ‘খাল পুনঃখনন শুধু কৃষকদের জন্য নয়, পুরো এলাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খাল সচল থাকলে পানি জমে থাকার সমস্যা কমবে, রাস্তা ও বসতবাড়ির ক্ষতি কম হবে এবং পরিবেশও ভালো থাকবে।’
তিনি খালটি পুনঃখননের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানান।
পবা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো: মাহমুদুল ইসলাম বলেন, ‘বৈরাগীর খাল পুনঃখনন প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে পবা উপজেলার কৃষি খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, পানি সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে এই প্রকল্প স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন পবা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী হোসেন, সদস্য সচিব সহকারী অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, যুগ্ম আহ্বায়ক সুলতান আহমেদ, কুতুবউদ্দিন বাদশা, পারিলা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান সাঈদ আলী মোরশেদ, পারিলা ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক রেজাউল করিম, সদস্য সচিব মোখলেসুর রহমান রেন্টু, জেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব আলামিন, নওহাটা পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল রহমান সহ বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, এলাকাবাসী পবা উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



