ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার উস্থি ইউনিয়নের তেরশ্রী গ্রামে শত শত বছরের ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে তেরশ্রী মসজিদ। স্থানীয়দের দাবি—এটির বয়স ৫০০ থেকে ৭০০ বছর। নির্মাণশৈলী, দেয়ালের পুরুত্ব ও গম্বুজ বিন্যাস দেখে অনেকেই এটিকে মোগল আমলের স্থাপনা বলে মনে করেন।
গম্বুজেই নামের রহস্য :
মসজিদটির সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন অংশ এর গম্বুজ স্থাপত্য। বিশাল কালো রঙের একটি প্রধান গম্বুজকে ঘিরে রয়েছে আরো ১৩টি ছোট গম্বুজ। স্থানীয়দের ভাষায়, এই ছোট গম্বুজগুলোকে বলা হয় ‘শ্রী’—অর্থাৎ সৌন্দর্য। ১৩টি ‘শ্রী’ থেকেই মসজিদের নাম হয়েছে ‘তেরশ্রী’। অনেকের মতে, মসজিদের নামানুসারেই গ্রামের নাম তেরশ্রী হয়েছে, যদিও এ বিষয়ে লিখিত তথ্য মেলেনি।
লোককথা ও প্রতিষ্ঠার ইতিহাস :
তেরশ্রী গ্রামের সরদার বংশের আশরাফ সিদ্দিকী ওরফে বাবলু সরদারের দাবি, তাদের পূর্বপুরুষদের মুখে শোনা যায়—মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মির্জা সরদার। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর–এর আমলে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তার মতে, এটিই গফরগাঁওয়ের প্রথম মসজিদ।
তবে এসব তথ্য মূলত জনশ্রুতি নির্ভর। প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে এখনো নির্দিষ্ট সাল বা শিলালিপি পাওয়া যায়নি।
স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণ উপাদান :
মসজিদের দেয়াল প্রায় পৌনে চার হাত পুরু। চুন-সুরকি ও কষজাতীয় উপাদান দিয়ে নির্মিত এ স্থাপনায় সিমেন্টের ব্যবহার ছিল না। ভেতর-বাইরে ছিল সূক্ষ্ম কারুকাজ, যার অনেকাংশ সময়ের ক্ষয়ে নষ্ট হয়েছে। ২০০৪ সালে সংস্কার করে নতুন করে রং করা হয়। বর্তমানে মূল কাঠামোর সাথে বাইরের অংশ কিছুটা সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যাতে প্রায় ১০০ মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন।
গবেষকের দৃষ্টিতে :
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক স্বপন ধর মসজিদের ছবি দেখে মন্তব্য করেছেন, নির্মাণশৈলীতে মধ্যপ্রাচ্যের আফগান মসজিদের প্রভাব রয়েছে। তার মতে, এটি ৫০০ বছরের বেশি পুরোনো এবং মোগল ঐতিহ্যের অংশ। বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম নেতা ঈশা খাঁ–এর সময়কার আফগান মুসলিম প্রভাবের সাথেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
সংরক্ষণে প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ :
বর্তমানে মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণ স্থানীয় উদ্যোগেই চলছে। সরকারি তদারকি বা সংরক্ষণ প্রকল্প এখনো কার্যকর হয়নি। ময়মনসিংহের শশীলজ জাদুঘরের পক্ষ থেকে চলতি অর্থবছরে জরিপ কাজ পরিচালিত হলেও প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।
মসজিদের ইমাম মাওলানা রফিকুল ইসলাম হেলালীর ভাষায়, ‘মুসলমানদের ঐতিহ্য আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এটি সংরক্ষণ করা জরুরি।’
ইতিহাসের নীরব প্রহরী :
শত বছরের পর শত বছর ধরে নামাজ, দোয়া আর মানুষের পদচারণায় মুখর এই মসজিদ আজো দাঁড়িয়ে আছে সময়ের সাক্ষী হয়ে। গফরগাঁওয়ের দক্ষিণাঞ্চলে এমন প্রাচীন ও নান্দনিক স্থাপনা বিরল বলেই দাবি স্থানীয়দের।
তেরশ্রী মসজিদ শুধু একটি ইবাদতখানা নয়—এটি ইতিহাস, স্থাপত্য ও লোকঐতিহ্যের এক অনন্য সমন্বয়; যার যথাযথ সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।



