মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গবাদিপশু প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারিরা।
শিবচর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এবছর শিবচরের কোরবানির পশুর সরবরাহে স্থানীয় চাহিদাকে ছাড়িয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় খামারিরা। ৬৬৫টি ছোট-বড় খামারে প্রায় ২১ হাজার ২০০টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে, যা দিয়ে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও বিপুল সংখ্যক পশু দেশের অন্যান্য স্থানে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। প্রাকৃতিক উপায়ে এসব খামারে সিন্ধি, পাকিস্তানি, অস্ট্রেলিয়ানসহ দেশীয় বিভিন্ন জাতের গরু মোটা তাজা করা হচ্ছে।
শিবচর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যমতে, গবাদি পশুর পরিসংখ্যানে দেখা যায়-এবার শিবচর উপজেলায় বিক্রির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ২১ হাজার ২০০টি গরু, ১২ হাজার ৩০টি ছাগল, ২৩০টি ভেড়া এবং অল্প সংখ্যক মহিষ রয়েছে। প্রতি বছর এই উপজেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা থাকে প্রায় ১৯ হাজার। সেই হিসাবে ৬৬৫টি খামারে প্রস্তুতকৃত ২১ হাজার ২০০ টি পশু দিয়ে চাহিদার মেটানোর পরেও অবশিষ্ট দুই হাজার ২০০টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
শিবচর উপজেলার উমেদপুর ইউনিয়নের ‘লিওন ঢালী এগ্রো ফার্ম’ টি চমৎকার একটি গরুর ফার্ম। ফার্মটির মালিক মো: লিওন ঢালী সাংবাদিকদের জানান, ২০১৬ সালে মাত্র দুইটি গরু দিয়ে ফার্মটির যাত্রা শুরু করেছিলেন। ধীরে ধীরে ফার্মটি এখন বিশাল আকারে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ফার্মটিতে ১০০টির বেশি গরু রয়েছে। ১০ জন শ্রমিক দিনরাত পরিশ্রম করে। নিয়মিত প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পরামর্শ নিয়ে গরুগুলোকে পালন করা হচ্ছে। ভেন্টিলেশন সিস্টেম ভালো হওয়ায় গরুগুলো রোগমুক্ত রয়েছে। সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে গরুগুলোকে মোটা তাজা করে কোরবানিতে বিক্রির জন্য উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এবং অবৈধভাবে ভারতীয় পশু আমদানি বন্ধ করা গেলে খামারিরা ভালো লাভের মুখ দেখবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ভালো দামে পশু বিক্রি করতে পারি তাহলে আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক সাড়া ফেলতে পারব। আগামীতো আমরা আরো বেশি পশু পালন করতে পারব।’
শিবচর উপজেলার কাদিরপুরে অবস্থিত শিবচরের সবচেয়ে বড় খামার ‘নাঈম এগ্রো ফার্ম’। খামারের মালিক মশিউর রহমান (মুবিন) খান বলেন, ‘আমার বাবা পাঁচ বছর আগে মাত্র ৩০টি গরু নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে আমার খামারে প্রায় ১৬০টি গরু, চারটি মহিষ, ২৩০টি ছাগল এবং বেশ কিছু ভেড়াও রয়েছে। নিয়মিত কাঁচা ঘাস ও ভুষি খাওয়াইয়া সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে পশুগুলো বড় করা হয়েছে।’
অন্যদিকে, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরাও বছরজুড়ে পরম যত্নে লালন-পালন করা পশুগুলো নিয়ে এখন বিক্রির প্রহর গুনছেন। পশুখাদ্যের উচ্চমূল্য ও চিকিৎসা ব্যয় এবং পরিবহন ব্যয় নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা থাকলেও শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে তারা বেশ সন্তুষ্ট।
খামারিদের প্রধান দাবি হলো-বাজারে পশুর ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। তারা মনে করেন, বাজার ব্যবস্থাপনা যদি সঠিক থাকে এবং আইন-শৃঙখলা পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে, তবে তারা লাভবান হবেন। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় পশুর প্রবেশ ঠেকাতে পারলে শিবচর, মাদারীপুরসহ দেশের খামারিরা পশুর সঠিক দাম পাবেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে।
হাট ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তায় কোরবানির পশু বিক্রির জন্য স্থানীয় হাটগুলোতেও ব্যাপক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। শিবচরের কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের বাংলাবাজার হাটের ইজারাদার সাগর হাওলাদার দৈনিক নয়া দিগন্তকে জানান, হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আগত ক্রেতা- বিক্রেতা,পাইকার-ব্যাপারীদের থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা করা হয়েছে। পুরো হাটটিকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। জাল টাকা শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে সুষ্ঠ সুন্দর সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি বজায় রাখতে সচেষ্ঠ রয়েছে আমাদের স্বেচ্ছাসেবক টিম।
শিবচর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হরিশ চন্দ্র বোস জানান, এবছর শিবচরে কোরবানির জন্য প্রায় ২১ হাজার ২০০টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে চাহিদা রয়েছে প্রায় ১৯ হাজার। কোরবানির পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত ভিজিট করে খামারিদের সহায়তা করা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর পশুপালনের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। কারন, গত বছর গৃহস্থরা ও খামারিরা পশু বিক্রি করে লাভবান হয়েছে বিধায় এ বছর পশু পালনের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিম খামারে গিয়ে অবৈধভাবে গরু মোটাতাজাকরণ হচ্ছে কী না, তা মনিটরিং করেছেন।
শিবচর উপজেলার ভেটেরিনারি সার্জন ডা: মোস্তাফা কামাল বলেন, ‘আমাদের ১৭ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেচ্ছাসেবী নিয়মিত খামারিদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।’
ভারতীয় গরু না এলে স্থানীয় খামারিরা এবার ন্যায্য মূল্য ও ভালো মুনাফা পাবেন বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান শিবচরের সকল খামারিদের প্রশংসা করে বলেন, ‘পশু পালনের মাধ্যমে খামারিরা যে সাফল্য দেখিয়েছেন, তা আমাদের উপজেলার জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। উপজেলা প্রশাসন সবসময় খামারিদের পাশে আছে। তাদের যেকোন সমস্যা সমাধানে সহায়তা প্রদান করা হবে। গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পে কোনো ধরনের ক্ষতিকর স্টেরয়েড, হরমোন জাতীয় ওষুধ বা রাসায়নিক ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে পশু পালন করা হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের লক্ষ্য হলো শিবচরের শিক্ষিত বেকার যুবকদের এ ধরনের কৃষিভিত্তিক ও প্রাণিসম্পদ খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে সম্পৃক্ত করা। শিবচর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।’



