টাঙ্গাইলে জামায়াত আমির

এবারের নির্বাচন নতুন বাংলাদেশ গড়ার

জুলাইযোদ্ধাদের সম্মান করার জন্য, তাদের আকাঙ্খাকে বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। জামায়াত আমির টাঙ্গাইলের আটটি আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের হাতে প্রতীক তুলে দেন।

মালেক আদনান, টাঙ্গাইল

Location :

Tangail Sadar
টাঙ্গাইলে জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান
টাঙ্গাইলে জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান |নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘এই নির্বাচন অতীতের কোনো নির্বাচন নয়। এটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচন। প্রায় দেড় হাজার জীবনের বিনিময়ে, ৩৪ হাজারের ঊর্ধ্বে জুলাই যোদ্ধাদের রক্ত, আহত ও পঙ্গুত্ব বরণের বিনিময়ে আজকের এই নির্বাচন। গত ৫৪ বছর নির্বাচন হয়েছে, সরকার গঠন হয়েছে। যারা সরকারে এসেছেন, আসার আগে তারা জনগণকে সুন্দর সুন্দর কথা শুনিয়েছেন, ওয়াদা দিয়েছেন। কিন্তু ওয়াদা ওয়াদার জায়গায় রয়ে গেছে, ওয়াদা তারা বাস্তবায়ন করেননি। যার কারণে সমাজে বৈষম্য দেখা দিয়েছিল, অপরাধ চরম মাত্রা ধারণ করেছিল। দুর্নীতি গোটা সমাজকে একদম ডুবিয়ে দিয়েছিল। এর বিরুদ্ধে আমাদের যুবসমাজ ফুঁসে উঠেছিল। একটা মাত্র স্লোগান উই ওয়ান্ট জাস্টিস। আমরা ন্যায় বিচার চাই।’

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে টাঙ্গাইল শহরের শহিদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যজোট জেলা শাখা আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

Tangail -Jamat Amir Picture-(03)-04.02.26

জুলাইযোদ্ধাদের সম্মান করার জন্য, তাদের আকাঙ্খাকে বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। জামায়াত আমির টাঙ্গাইলের আটটি আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের হাতে প্রতীক তুলে দেন।

‘আগামী ১২ তারিখে এই জাতি একটি সুষ্ঠ নির্বাচন আদায় করে ছাড়বে’ উল্লেখ করে ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমি বিভিন্ন জায়গায় শুনতে পাচ্ছি যারা আমাদের মতো মজলুম ছিলেন সাড়ে ১৫ বছর। তারা এখন ভিন্ন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। মানুষকে কষ্ট দিচ্ছেন, চাঁদাবাজি করছেন, দুর্নীতি করছেন, মামলা বাণিজ্য, দখল বাণিজ্য করছেন। শুধু তাই নয়, এই নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য নির্বাচনী অ্যাজেন্টদের ঘরে ঘরে গিয়ে নাকি তারা হুমকি দিচ্ছেন। ভুলে যান, সেদিনের কবর রচনা হয়ে গেছে।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমার ভোট আমি দেবো তোমার ভোটও আমি দেবো সেই দিন আর এখন নাই। আপনার ভোট আপনি দিবেন, আমরাটা আমি দেবো। ইনশাল্লাহ, আপনার পছন্দমতো আপনার ভোট দেন, ১৮ কোটি মানুষ তাদের পছন্দমতো তাদের ভোট দিবেন। এখানে গায়ের শক্তি, কালো টাকা, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যানুবারিং কিছুই মানা হবে না। যেই যুবকরা খালি হাতে বুক চিতিয়ে মুক্তি আনতে পেরেছে, সেই যুবকরা ১২ তারিখেও বিজয় লাভ করবে ইনশাআল্লাহ।’

Tangail -Jamat Amir Picture-(02)-04.02.26

যুবকদের উদ্দেশ্য করে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘এদেশের যুবকরা বেকারভাতা চায় না। এই যুবকরা কাজের অধিকারের জন্য লড়াই করেছিল। আমরা কথা দিচ্ছি তোমাদের হাতকে শিক্ষা আর প্রশিক্ষণ দিয়ে ভরে দেবো ইনশাআল্লাহ। তারপর তোমাদের মজবুত হাতে কাজ তুলে দেবো ইনশাআল্লাহ। এরপর বলব আমাদের বাংলাদেশটা তোমরা গড়ে নাও। আমরা আগামীর বাংলাদেশ তোমাদেরও হাতে তুলে দিতে চাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা জাতিকে নিয়ে পিছনে যেতে চাই না। আমরা জাতিকে নিয়ে সামনে যেতে চাই। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে শিশুটি উপযুক্ত শিক্ষা পাবে, উপযুক্ত নাগরিক হয়ে সুস্থভাবে বড় হওয়ার জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাবে, নিরাপদ রাষ্ট্র পাবে, নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাবে। এরপর যখন বড় হবে, হাতের মধ্যে কাজ পাবে। এরপর যখন আরো বড় হবে দেশটাকে গড়ে দেবে। আমরা সেই বাংলাদেশটা চাই যে বাংলাদেশে আমার মা, আমার বোন, আমার মেয়ের শতভাগ নিরাপত্তা এবং মর্যাদা নিশ্চিত হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা সেই বাংলাদেশ চাই যে বাংলাদেশে মানুষ তার যোগ্যতা এবং তার অবদান অনুযায়ী মূল্যায়িত হবে।

‘বাংলাদেশে আইন হবে সবার জন্য সমান’ উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘একজন সাধারণ মানুষ অপরাধ করলে নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য তার যে নির্দিষ্ট শাস্তি হবে, দেশের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি একই অপরাধ করলে তাদেরকেও ছাড় দিয়ে কথা বলা হবে না। তাদের একই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। বিচারের নামে কোনো দায়মুক্তি নাই। এ বিচার মেনে নিতে হবে। এই সমাজে ন্যায়বিচার যখন কায়েম হবে বাংলাদেশ তখন রকেট গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।’

‘জামায়াতে ইসলামী সবচাইতে বড় মজলুম সংগঠন’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আর কোনো সংগঠনের শীর্ষ ১১ জন নেতাকে শেখ হাসিনা সরকার খুন করে নাই, আর কোনো সংগঠনের নিবন্ধন কেড়ে নেয় নাই, আর কোনো সংগঠনের প্রতীক কেড়ে নেয় নাই, আর কোনো সংগঠনের সমস্ত অফিস তালাবদ্ধ করে রাখে নাই, আর কোনো সংগঠনের নেতৃবৃন্দের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেয়া হয় নাই। আর কোনো সংগঠনকে শেষপর্যন্ত নিষিদ্ধও ঘোষণা করা হয় নাই। এটাই একমাত্র সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে আমরা বিশ্বাস করি, যারা সরকারের বাইরের বিরোধী দল ছিলাম সকলেই মজলুম ছিলেন। শুধু বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা মজলুম ছিলেন না। এদেশের ১৮ কোটি মানুষ মজলুম ছিল।’

‘দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিকালে জামায়াতে ইসলামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে‘ উল্লেখ করে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সিজনাল পলিটিশিয়ান না। আমরা বসন্তের কোকিল না যে যখন নির্বাচন আসবে তখন এসে নতুন রঙ ধারণ করে সুন্দর সুন্দর কথা নিয়ে আমরা হাজির হবো না। আমরা তাই না। আপনারা সাক্ষী সাড়ে ১৫ বছর আমাদের ওপরে এত জুলুম হওয়ার পরেও আমরা একদিনের জন্যও জনগণকে ছেড়ে কোথাও যাইনি। এই মাটি কামড় দিয়েই আমরা ছিলাম। আল্লাহ আমাদেরকে এইখানে রেখেছিলেন। দফায় দফায় জেলে গিয়েছি, ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছি, অফিসে ঢুকতে পারি নাই, কিন্তু বাংলাদেশে ছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ। এখনো আল্লাহ রেখেছেন। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে সুদিন দুর্দিন কী আসে আল্লাহ ভালো জানেন, কথা দিচ্ছি বাংলাদেশ ছেড়ে কোথায় যাবো না ইনশাআল্লাহ। আছিল থাকব। আপনাদের সুখেও থাকব দুঃখেও থাকব।’

‘আগস্টের ৫ তারিখের পর জামায়াত কারো ওপর প্রতিশোধ নেয়নি’ উল্লেখ করে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘যারা হাজার হাজার মামলা দিয়ে আমাদের দফায় দফায় জেলে নিয়েছে, রিমান্ডে নিয়ে আমাদের নির্যাতন করেছে, আমাদের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা আদায় করেছে, আমরা তাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার লাখ লাখ মামলা দেবো না। আমরা বলেছিলম প্রতিকী কিছু মামলা হবে যাতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি না হয়। আমরা আমাদের কর্মীদের বলেছিলাম সাবধান, মামলা দিতে গিয়ে একজন নিরপরাধ মানুষকেও মামলার আসামি করা যাবে না। আমরা জাতির সাথে কথা রেখেছি। শুধু তাই নয়, ৫ আগস্ট থেকে চারদিন সংগত কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে ছিল না, তখন আমাদের নেতাকর্মীরা দেশে পাহারাদারের দায়িত্ব পালন করেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছি। এই স্বপ্ন জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধাদের। তারা যে দেশটা দেখতে চেয়েছিল আমরা সেই দেশটাকে গড়ার শপথ নিয়েছি। আপনারা আমাদের সাথে ইনশাআল্লাহ থাকবেন? তখন সবাই সমস্বরে বলেন, থাকবো ইনশাআল্লাহ। তখন জামায়াত আমির বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, তাহলে ১২ তারিখের টার্নিং পয়েন্টে জাতির বাক বদলে দেয়ার জায়গায় ঐতিহাসিক দায়িত্ব আমাদের পালন করতে হবে ইনশাআল্লাহ।’

জনসভায় সভাপতিত্ব করেন টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনের ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমির আহসান হাবীব মাসুদ।

বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন- জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ড. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল ড. খলিলুর রহমান মাদানী এবং জামায়াতে ইসলামী ঢাকা উত্তরাঞ্চলের অন্যতম সদস্য মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন।

অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- টাঙ্গাইল-২ আসনের প্রার্থী জামায়াতের জেলা সেক্রেটারি মো: হুমায়ুন কবীর, টাঙ্গাইল-৩ আসনের প্রার্থী এনসিপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল্লাহ হায়দার, টাঙ্গাইল-৪ আসনের প্রার্থী জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক খন্দকার আব্দুর রাজ্জাক, টাঙ্গাইল-৬ আসনের প্রার্থী ডা: এ কে এম আব্দুল হামিদ, টাঙ্গাইল-৭ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ এবনে আবুল হোসেন, টাঙ্গাইল-৮ আসনের প্রার্থী অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম খান, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক খন্দকার মাওলানা শাহাবুদ্দিন লেবার পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জহুরা খাতুন জুই প্রমুখ।