সাটুরিয়ায় দুধের জোয়ার, ঘণ্টায় বিক্রি ৩০০ মণ

প্রতিদিন প্রায় পাঁচ শতাধিক ক্ষুদ্র চাষি ও খামারিদের দুধ সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যেই চলে জমজমাট বেচাকেনা। দুধের গুণগত মান ভেদে দরদাম চলে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৯০ টাকায়। এ সময় পাইকারদের মধ্যে চলে দুধ কেনার প্রতিযোগীতা।

সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা

Location :

Saturia
দুধের হাটে যাচ্ছেন খামারিরা
দুধের হাটে যাচ্ছেন খামারিরা |নয়া দিগন্ত

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গোপালপুর বাজারে প্রতিদিন সকালে বসে দুধের এক বিশাল হাট। মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে এই বাজারে প্রায় ৩০০ মণ দুধ বিক্রি হয়। চরাঞ্চল ও নদীবেষ্টিত এলাকা থেকে আসা ওই বাজারে দুধের গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশের ক্রেতা ও ঘোষদের চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকারদের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে গোপালপুর বাজার।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ধলেশ্বরী নদীর পশ্চিমপাড়ের রাজৈর, বরাইদ, ছনকা, কাকরাইদ, নাটুয়াবাড়ি, গালা, কলিয়া, ধুলোটসহ আশাপাশের গ্রামের খামারিরা দুধ বিক্রির জন্য খেয়া নৌকায় নদী পার হয়ে আসেন গোপালপুর বাজারে। অন্যদিকে নদীর পানি কমে যাওয়ায় কেউ কেউ দুধের কলস মাথায় নিয়ে পায়ে হেঁটে নদী পার হচ্ছেন। নদী পার হওয়ার পরে বেশ কিছু রাস্তায় তাদের দুধ ভর্তি সিলভারের কলস মাথায় নিয়ে হাঁটতে হয়। সারিবদ্ধভাবে এসব খামারিরা দুধের কলস মাথায় নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গোপালপুর বাজারে যাওয়ার দৃশ্যটি নদীর পারে হওয়ায় দেখতে মনোমুগ্ধকর।

প্রতিদিন প্রায় পাঁচ শতাধিক ক্ষুদ্র চাষি ও খামারিদের দুধ সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যেই চলে জমজমাট বেচাকেনা। দুধের গুণগত মান ভেদে দরদাম চলে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৯০ টাকায়। এ সময় পাইকারদের মধ্যে চলে দুধ কেনার প্রতিযোগীতা। এই হাটে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন বড় পাইকার আসেন। কেউ এই দুধ সংগ্রহ করে সরাসরি ঢাকায় নিয়ে যান, আবার কেউ দুধ থেকে মাখন তৈরি করে তা রাজধানীর অভিজাত হোটেল ও বাজারে সরবরাহ করেন।

স্থানীয়রা জানায়, ৮০ দশকের শুরুর দিকে গোপালপুর বাজারের আশপাশে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বাজার ছিল না। নিজেদের জমির ফসল ও গাভির দুধ বিক্রি করতে বিড়ম্বনায় পড়তে হতো কয়েক গ্রামের কৃষক ও খামারিদের। হাট বসানোর পরিকল্পনা নিয়ে ১৯৮৫ সালে বর্তমান বরাইদ ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী মো: আব্দুল হাই গোপালপুর গ্রামে কিছু জমি কিনেন। পরে গ্রামের কৃষকেরা উৎপাদিত ফসল, দুধ ও কৃষি পণ্য সেখানে নিয়ে বিক্রি করা শুরু করে। ধীরে ধীরে কয়েক গ্রামের মানুষ ওই বাজারে পণ্য বেচাকেনা শুরু করেন। শুরুর দিকে গোপালপুর বাজারের আশপাশের মানুষ এসব দুধের ক্রেতা ছিলেন।

নদীর ওপারের চরাঞ্চলে গবাদি পশুর জন্য পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক ঘাস পাওয়ায় সেখানকার দুধের ঘনত্ব ও স্বাদ অন্য এলাকার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে পাইকাররা এখান থেকে দুধ কিনতে বেশি আগ্রহী হন একাধিক ক্রেতা ও পাইকাররা জানান। ব্যবসায়ীদের ধরণা প্রতিদিন এ বাজারে আট থেকে ১০ লাখ টাকার দুধ বেচাকেনা হয়ে থাকে।

উপজেলার রাজৈর এলাকার দুধ বিক্রেতা কুলসুম মধ্যে বয়স্ক এক গৃহবধু বলেন, ‘তিনটা গাভী পালন করেই সংসার চলে। একটি দুধ দোহন করা যায়। প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ কেজি দুধ দেয় যা বাজারে আসা মাত্রই পাইকাররা ৮০ টাকা দরে দুধের দাম দেয়। তবে দুধের দামের তুলনায় গো খাদ্যের দাম তুলনামুলক ভাবে বেশি।’

উপজেলার গোপালপুর এলাকার দুধ বিক্রেতা হালিম মিয়া (৫০) বলেন, ‘দুইটা গাভীর প্রতিদিন ২০ থেকে ২২ কেজি দুধ হয়। পাইকাররা ৭০ টাকা করে দুধের দাম দিয়েছে।’

এ বাজারে প্রতিদিন ৩০০ মণের বেশিও দুধ বিক্রি হয় বলে জানান তিনি।

উপজেলার দরগ্রাম এলাকার পাইকেরী দুধ ক্রেতা জীবন চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘এ বাজারে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ মণ দুধ আসে। সাটুরিয়ার অন্যান্য বাজারের থেকে বিখ্যাত এবং সকালে হওয়ায় দুধের দাম বেশি দিয়ে অন্যান্য পাইকারদের সাথে প্রতিযোগীতা করে কিনতে হয়। প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ মণ দুধ ক্রয় করি। যা বাড়িতে নিয়ে দুধের ছানা তৈরী করে ঢাকায় বিক্রি করি।

গোপালপুর বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো: মজিবর রহমান বলেন, ‘বাজারটির প্রধান আকর্ষণ দুধের বাজার। দুধের জন্য অনেক আগে থেকেই নাম ডাক থাকায় দূরদুরান্ত থেকে পাইকাররা পিকআপ নিয়ে দুধ কিনতে আসে। এ বাজারের আশপাশের এলাকার প্রতিবাড়িতেই গাভী পালন করে। প্রচুর দুধ আসলেও বিক্রি হয় মাত্র এক ঘণ্টায়। তবে রাস্তাঘাট ও যোগাযোগের বেহাল অবস্থার কারণে আরও খামারিরা আসতে পারে না। তারপরও প্রায় ৩০০ মণ দুধ বিক্রি হয়।’

এ বিষয়ে সাটুরিয়া উপজেলা ভেটেনারী সার্জন ডা: মো: খোকন হোসেন বলেন, ‘গোপালপুর বাজারের দুধের এই বিশাল সরবরাহ আমাদের স্থানীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। বিশেষ করে চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা গরুর দুধ পুষ্টিগুণে অনন্য। আমরা প্রাণিসম্পদ দফতরের পক্ষ থেকে নিয়মিত খামারিদের পরামর্শ দিচ্ছি, বিভিন্ন ফ্রি চিকিৎসা সেবা দিচ্ছি যাতে দুধের পরিচ্ছন্নতা ও মান বজায় থাকে। খামারিরা যাতে দুধের সঠিক মূল্য পায় এবং দুধ সংরক্ষণের আধুনিক সুবিধা পায় সে লক্ষ্যেও আমরা কাজ করছি।

তিনি আরো বলেন, ‘সাটুরিয়ার এই দুগ্ধ উৎপাদন শুধু স্থানীয়দের স্বাবলম্বীই করছে না, বরং রাজধানীর দুগ্ধ চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করছে।’