পদ্মা-যমুনায় কুয়াশায় কাজে আসছে না ফগ লাইট, দায় নিচ্ছেন না কেউ

আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের ভাইয়ের ঠিকাদারিতে স্থাপিত ফগ লাইটগুলো শুরু থেকেই মানহীন ছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ে।

এম মনিরুজ্জামান, রাজবাড়ী

Location :

Rajbari
কুয়াশায় কাজে আসছে না ফগ লাইট
কুয়াশায় কাজে আসছে না ফগ লাইট |সংগৃহিত

রাজধানী ঢাকার সাথে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট। অথচ এই নৌরুটে শীত এলেই থমকে যায় যোগাযোগ ব্যবস্থা। ঘনকুয়াশায় প্রায় নিয়মিতই বন্ধ থাকে ফেরি চলাচল। যাত্রী ও চালকদের ভোগান্তি কমাতে প্রায় এক দশক আগে বসানো পাঁচ কোটি টাকার ফগ অ্যান্ড সার্চ লাইট আজ কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে কোনো কাজে আসছে না।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটের ১০টি ফেরিতে উন্নত প্রযুক্তির ফগ অ্যান্ড সার্চ লাইট স্থাপন করে। উদ্দেশ্য ছিল— শীত মৌসুমে ঘনকুয়াশাতেও নিরাপদে ফেরি চলাচল অব্যাহত রাখা। সে সময় প্রকল্পটি ঘিরে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও বাস্তবে একদিনের জন্যও সেই আলো আর নৌপথ দেখাতে পারেনি।

এ রুটের যান ও ফেরি চালক এবং স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের ভাইয়ের ঠিকাদারিতে স্থাপিত ফগ লাইটগুলো শুরু থেকেই মানহীন ছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। অনেকের দাবি, এই ফগ লাইট কখনোই কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়নি। ফলে প্রকল্পটি অকার্যকর হয়ে যায়।

জানা গেছে, কুয়াশার মধ্যে নৌপথে ফেরি সার্ভিস চালু রাখতে ২০১৫ সালে ১০টি ফেরিতে পরীক্ষামূলকভাবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘ফগ লাইট’ স্থাপন করেছিল নৌ মন্ত্রণালয়। সাড়ে সাত হাজার কিলোওয়াটের প্রতিটি ফগ লাইটের ক্রয় বাবদ খরচ ধরা হয়েছিল অর্ধকোটি টাকার ওপরে। কিন্তু স্থাপনের পর থেকেই মূল্যবান ওই ফগ লাইটগুলো বিকল হয়ে আছে। চলতি বছর শীত মৌসুমে ১২০ ঘণ্টা ফেরি অচল, ঘনকুয়াশার কারণে এই নৌরুটে প্রায় ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। ফলে উভয়ঘাটে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। বাস, ট্রাক, অ্যাম্বুলেন্স, পণ্যবাহী যানসহ হাজারো যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে পড়ে। যাত্রীদের মধ্যে দেখা দেয় চরম ভোগান্তি অসুস্থ রোগী পরিবহনে সৃষ্টি হয় মারাত্মক ঝুঁকি।

চালকরা জানান, কুয়াশা একটু ঘন হলেই ফেরি বন্ধ ঘোষণা আসে। অথচ পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে বসানো ফগ লাইট থাকলে এমন পরিস্থিতির কথা ছিল না। কুয়াশার সমস্যা সমাধানে দায় চাপানো আর নীরবতা, ফগ লাইট বিকল থাকার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সমাধান দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিআইডব্লিউটিসি ও উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে দেখা গেছে দায় চাপানোর প্রবণতা।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাথী দাস বলেন, ‘এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট শাখার ব্যবস্থাপক মো: সালাহউদ্দিনের সাথে কথা বলুন।’

বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট শাখার ব্যবস্থাপক মো: সালাহউদ্দিন বলেন, ‘এ বিষয়টি মূলত কারিগরি বিভাগের।’

তিনি আরো জানান, ফগ লাইটের বিষয়ে দৌলতদিয়া প্রান্তে কোনো কাগজপত্র বা ফাইল নেই। এ বিষয়ে আপনাকে দেয়ার মতো কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। আপনি কারিগরি, নৌ ও টেকনিক্যাল বিভাগের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

অন্যদিকে কারিগরি বিভাগের দাবি, জানমালের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই কুয়াশায় ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হচ্ছে। ঘনকুয়াশায় দৃশ্যমানতা একেবারে শূন্যের কাছাকাছি নেমে গেলে নিরাপত্তার স্বার্থে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

একজন নিয়মিত যাত্রী বলেন, প্রতিবার শীত এলেই একই নাটক। কোটি টাকা খরচের কথা শুধু কাগজে আছে, মাঠে তার কোনো অস্তিত্ব নেই।

২১ জেলার মানুষের ভোগান্তি রাজবাড়ী জেলার দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জ জেলার পাটুরিয়া ঘাট দিয়ে প্রতিদিন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ রাজধানীতে যাতায়াত করে। বিআডব্লিউটিসির তথ্য মতে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে সাড়ে তিন হাজার ছোটবড় গাড়ি পারাপার হয়ে থাকে। ফলে এই নৌরুটে ফেরি বন্ধ মানেই অর্থনীতি, চিকিৎসা, ব্যবসা ও নিত্যপণ্যের সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব।

নৌপথ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নৌরুটে আধুনিক নেভিগেশন সিস্টেম, কার্যকর ফগ লাইট ও বিকল্প প্রযুক্তি চালু করা জরুরি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহির অভাবে বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।

দ্রুত কার্যকর উদ্যোগে যাত্রী, চালক ও স্থানীয়দের দাবি— অকার্যকর ফগ লাইট প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত এবং দ্রুত মেরামতের মাধ্যমে নৌরুটে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা হোক। নচেৎ প্রতিবছর শীত এলেই দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া নৌরুটে অচলাবস্থা আর দুর্ভোগ যেন অনিবার্য নিয়তি হয়েই থাকবে।

এর আগে, ঘনকুয়াশার কারণে প্রায় টানা পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল পুনরায় শুরু। গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৪টার দিকে কুয়াশার ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় নৌপথে দৃশ্যমানতা কমে গেলে যাত্রী ও যানবাহনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় ফেরি চলাচল বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ।

কুয়াশার ঘনত্ব কমে আসায় গত বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ১৫টি ফেরি দিয়ে পুনরায় পারাপার শুরু হয়। ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হওয়ায় ঘাট এলাকায় আটকে পড়া যানবাহন ও যাত্রীরা স্বস্তি ফিরে পান। তবে টানা পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা করে ফেরি চলাচল প্রায়াই বন্ধের কারণে দৌলতদিয়া ঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে মহাসড়কের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানবাহনের দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়।

ফরিদপুর থেকে ছেড়ে আসা সাউদিয়া পরিবহনের যাত্রী সোহেল আরমান নামের এক পরিবহন চালক বলেন, ‘সরকার যে ফগ লাইটটা দিয়েছে কুয়াশার জন্য সেটা তো ফেরিতে ব্যবহার করে না। যদি করত তাহলে তো কুয়াশার জন্য ফেরি বন্ধ থাকত না। এটার জন্য তো আর বিকল্প কেউ কথাও বলবে না, যদি কথাও বলে তাহলে কে বলবে? আমাদের কথা তো কেউ শুনবে না।’

চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা সোহাগ নামের আরেক চালক বলেন, ‘ফগ লাইট ব্যবহার হলে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমবে, ফেরি চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। কুয়াশার জন্যই তো ফগ লাইট দেয়া সেটা যদি ব্যবহারই না করে তাহলে সেটা দেয়ার দরকার কী ছিল। আমরা চাই সবসময়ই ফেরি চলাচল থাকুক।’

দৌলতদিয়া ঘাটের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জানি প্রত্যেকটা রোরো বড় ফেরিতে ফগ লাইট লাগানো হয়েছে, কুয়াশা পড়লে ওই ফগ লাইটটা জ্বালালে নির্বিঘ্নে ফেরি চলাচল করতে পারবে। কুয়াশা পড়লে ফেরি বন্ধ হয়ে যায়। আসলে এই ফগ লাইটগুলো ব্যবহার হচ্ছে না। এখানে কোটি কোটি টাকা সরকার ব্যয় করছে। শীতের মৌসুমে যতদিন কুয়াশা পড়ছে কোনোদিন আমি দেখিনি, এই নদীতে কুয়াশার মধ্যে ফগ লাইট ব্যবহার করে ফেরি চলাচল হইছে। আমার হিসেবেই আসে না সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে কেনো এ ফগ লাইটগুলো লাগায়ছে।’

যেসব ফেরিতে ফগ লাইট স্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে রো রো ফেরির এক মাস্টার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইনচার্জ (মাস্টার) বলেন, কয়েক বছর আগে ১০টি ফেরিতে কুয়াশার ফগ লাইট স্থাপন করা হয়। এক দিন পরই এই ফেরির লাইট নষ্ট হয়ে যায়। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত সমাধান হয়নি। এ ছাড়া এই লাইট দিয়ে ভারি বা মাঝারি কুয়াশার মধ্যেও চলাচল করা যায় না। সাধারণ হালকা কুয়াশা হলে সেটা কিছুটা কাজে লাগে। এর চেয়ে পুরোনো সার্চ লাইটগুলোই অনেক কার্যকর।