ঘন ঘন ভূমিকম্পে কাঁপছে সিলেটসহ পুরো দেশ। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের ২৬ দিনেই নয় বার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশ। স্বল্প সময়ে এমন ঘন ঘন কম্পন দেশের ভূতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এমন ঘন ঘন ভূমিকম্পের ঘটনা অতীতে আর ঘটেনি বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। যদিও কম্পনগুলোর মাত্রা মৃদু ও মাঝারি। তবুও ভূমিকম্পপ্রবণ ডেঞ্জার জোন সিলেটে সাধারণ মানুষের আতঙ্ক কাটছে না। বিশেষ করে নগরের ২০ লাখ মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের আশপাশের অঞ্চল এবং দেশের ভেতরে ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা বাড়ছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে এটি বড় ধরনের ভূমিকম্পের পূর্ব লক্ষণ হতে পারে।
ইউএসজিএসের তথ্য বলছে, চলতি ফেব্রুয়ারি যেন দেশের ভূ-তাত্ত্বিক ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী মাস। এ মাসে মাত্র ২৬ দিনেই ভূমিকম্প হয়েছে নয় বার। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে এবং আগের দিন বুধবার দিবাগত রাতে ভূমিকম্প হয়েছে সিলেটসহ সারাদেশে।
বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৪ মিনিট ৫ সেকেন্ডে ভূকম্পন অনুভূত হয়। আবহাওয়া অধিদফতরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৬।
সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা জানান, এটি একটি মৃদু ভূমিকম্প। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ৪৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ভারতের সিকিম অঞ্চলে। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
আগের দিন বুধবারও রাত ১০টা ৫১ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়, সেটির উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারে।
চলতি ফেব্রুয়ারিতে প্রথম ভূকম্পনটা অনুভূত হয় মাসের প্রথম দিনেই (১ ফেব্রুয়ারি)। সেদিন ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় মৃদু ভূমিকম্প হয়। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৩। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে।
এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পরপর দু’টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যেগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারে। ওই দু’টি ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৯ ও ৫ দশমিক ২।
একই দিন ভোর ৪টা ৩৬ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও ভূকম্পন অনুভূত হয়। ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলা, যা ঢাকা থেকে প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১।
এরপর ৯ ফেব্রুয়ারি ভোরে এবং ১০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় দু’টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এ দু’টি ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩ ও ৪।
১৯ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ৪৬ মিনিটে আবার সিলেট অঞ্চলে ভূকম্পন অনুভূত হয়। ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা। এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১।
সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত দেশে মোট নয় বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ঘন ঘন এই ভূমিকম্পের ঘটনায় বিশেষজ্ঞরা বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভূতত্ত্ববিদরাও তাই সতর্ক বার্তা দিচ্ছেন।
ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার গণমাধ্যমকে জানান, এই ঘন ঘন কম্পন বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বলক্ষণ হতে পারে। বাংলাদেশ ভারতীয় এবং ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে বড় ধরনের ভূ-অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বিরাজ করছে।
তিনি আরো জানান, দীর্ঘদিন শক্তি জমা হয়ে থাকলে তা বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
যদি বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প অনুভূত হয়, তাহলে ঝুঁকিতে পড়বে রাজধানী ঢাকা। কারণ, মেগা সিটিটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। এ ছাড়া শহরটির অনেক ভবন বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি হয়নি। ফলে বড় ভূমিকম্প হলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকার পর বড় ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট। কারণ ডাউকি ফল্টের কারণে সিলেট অঞ্চল বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। এখানে ৬ থেকে ৭ মাত্রায় আঘাত হানলে বড় রকমের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সেজন্য সময়ের আগেই সবাইকে প্রস্তুতি নেয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। এক্ষেত্রে শুধু উদ্ধার তৎপরতা নয়, বরং বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং ভূমিকম্প-সহনশীল স্থাপনা নির্মাণ করাতেও জোর দিচ্ছেন তারা। এছাড়া নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা ও নিয়মিত মহড়া বড় দুর্যোগে প্রাণহানি কমাতে সাহায্য করতে পারে। সেজন্য ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেয়া যেতে পারে।
ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘সতর্কতার বিষয় হলো, ভূমিকম্পে আগে থেকে পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব নয়। বরং ছোট কম্পন দেখে ঝুঁকি আঁচ করে নিতে হয়। কখনো যদি ভূমিকম্পের সময় ঘরের ভেতরে থাকা হয়, তাহলে ‘ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড অন’ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।’



